Travel Guides

ট্রাভেল প্লানিং নিজগুনে অভূতপূর্ব এবং বিপর্যস্ত্যকারী এক্সপেরিয়েন্স। এক অজানা শহরের অ্যাকমোডেশন্‌ বুকিংয়ের ভালো খারাপ দিক জানা, বিচার বিবেচনা করা, এক ধরনের লার্নিং কার্ভের মত। অবশ্যই অনেকের ক্ষেত্রে ট্রাভেল এজেন্ট এখনো একটি সহজ মাধ্যম, তবে বর্তমান সময়ে অনলাইন বুকিংয়ের জনপ্রিয়তার দরুন অনেকেই DIY প্লানিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন।

তবে ট্রাভেল এজেন্ট পুরাতন মনে হলেও কোন স্থানের সম্বন্ধে পরামর্শ অথবা ডিসকাউন্টেড ডীলের জন্য এখনো এক জনপ্রিয় ঠিকানা।

আমার কথা যদি বলি, নিজ হাতে ট্রাভেল প্লান করা, নিজের রাস্তা নিজে ঠিক করা, এটা আমার কাছে সবথেকে বেশী আকর্ষনীয়; নাকি কোন ট্রাভেল এজেন্টের পুর্ব-নির্ধারিত এবং নির্দিষ্ট পথে ভ্রমন করা। কোন একটা ট্রিপের আগে তার সম্বন্ধে রিসার্চ করা, ট্রিপের মতই আনন্দদায়ক! মজার কথা হচ্ছে ট্রাভেলের ছুটিটাই কিছুতা ম্লান মনে হতে পারে যেই প্লানিং শেষ হয়ে যায় 🙂

যদি নিজে বুকিং/প্লানিং করতেই হয়, তবে তার নিয়মও খুব বেশী জটিল নয়! যেমন, সবার প্রথম ‘দিন’ ঠিক করা কখন যাওয়া এবং কখন ফেরা, তারপর ট্রান্সপোর্টের বুকিং দেখা; ট্রান্সপোর্টের বুকিংয়েরও আগেও দেখে নিন সেই সময়ে কোন বড় ইভেন্টের সম্ভবনা আছে কিনা, তাকে ঘিরে অ্যাকমোডেশনে্‌র অপ্রতুলতার সম্ভবনা আছে কিনা। তারপর ট্রান্সপোর্টেশনের বুকিং শুরু করুন, দরকার পড়লে তারপরেই অ্যাকমোডেশনে্‌র বুকিং করে নিন। ট্রেনের টিকিটের ক্ষেত্রে চেষ্টা করবেন বেড়াতে যাবার ১২০ দিন আগে ট্রেনের টিকিট বুক করে নিতে। তারপরে নিজের ভ্রমন ইচ্ছা গুলোকে ভাগ করে নিন, দিন, থাকা, ইন-স্টেট ট্রান্সপোর্টেশনে্‌র হিসাবে। সঙ্গে দরকারী প্রি-বুকিং এবং must-do-activities এগুলোরও রিসার্চ চলতে পারে! মনে রাখবেন এখন বেড়াতে গেলে সঙ্গে সচিত্র পরিচয় পত্র রাখাটা বাধ্যতামূলক।

বাজেট প্ল্যানিং

বেড়ানোর প্ল্যান বাজেট প্ল্যান বিনা সম্পূর্ন নয়। কোথাও বেড়াতে যাবার ঠিক করার পরেই বাজেট প্ল্যানও এসে যায় যার ওপর নির্ভর করে আপনার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো – ট্রেন/ফ্লাইট, হোটেল এবং অন্যান্য আনুসঙ্গিক খরচাপত্তর। সঙ্গে পুরো টাকা নেয়ার থেকে চেষ্টা করুন অনলাইন ব্যাঙ্কিং, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেও খরচা করতে। আজকাল মোটামুটি সব জায়গাতেই ATM আউটলেট পেয়ে যাবেন। খরচা কমাতে পিক সিজন এড়িয়ে ঘোরাই ভালো। এক্ষেত্রে কোথায় কোন সময়ে কোন ফেস্টিভল বা ইভেন্টের সম্ভবনা আছে কিনা জেনে নিন।

হোটেল বুকিং

বেড়ানোর ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল হোটেল বুকিং। চেষ্টা করবেন যোগাযোগের সুবিধার্থে এমন একটা জায়গায় থাকতে যেখান থেকে ট্রান্সপোর্টেশন, দোকান-পাট ইত্যাদির সুবিধা হয়। তবে অনেকেই এখন অফ্‌বিট ট্রাভেলের ক্ষেত্রে একটু ভিড়ভাড়হীন জায়গায় থাকতে পছন্দ করেন যা মূল লোকালিটি থেকে একটু বেরিয়ে হয়, কিন্তু অবশ্যই খেয়াল রাখতে চাইবেন ট্রান্সপোর্টেশনের যেন সুবিধা থাকে। নিরিবিলি জায়গার ক্ষেত্রে আগে থেকে একটু জেনেও নেবেন। দালালদের কথামত হোটেল বুক করবেন না। স্থানীয় কিছু মানুষ, রিক্সা চালক, অটো চালক, ট্যাক্সি ড্রাইভার, এঁরাই সাধারনতঃ হোটেল দালাল হিসাবে কাজ করে। বেশীরভাগ সময়ে পর্যটকরা ভোগান্তির শিকারই হন এঁদের থেকে। যে হোটেলে উঠবেন জেনে নিন তার ঘরের কন্ডিসন এবং অন্যান্য সুবিধাগুলো সম্বন্ধে। হোটেলের ফোন নাম্বার, ঠিকানা অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন।

জেনে নিন কোন অকেশন বা ইভেন্টের সম্ভবনার কথা। সাধারনতঃ এই রকম সময়ে পর্যটকেদের ভিড় বেড়ে যায়। সিজনে বেড়াতে গেলে ভিড় এড়াতে আগে থেকেই বুকিং করে নিন। এখন সারাদেশে বুকিং ইন্টারনেটের মাধ্যমেই খুবই সত্বর হয়ে যাওয়া সম্ভব। বুকিং-এর পর আরও নিশ্চিন্ত হতে হোটেলের রিসেপসনে ফোন করে কনফার্ম করতে পারেন আপনার বুকিং সেখানে পৌঁচেছে কিনা। হোটেলের চেক ইন এবং চেক আউটের সময় অবশ্যই জেনে নেবেন।

লাগেজ

জিনিষ যতটা হালকা রাখতে পারবেন ততটাই ভালো, কারন বইতেও হয়তো আপনাকেই হতে পারে। মনে রাখবেন কুলী সবসময় পাওয়া নাও যেতে পারে। জিনিষের বোঝা বেশী হলে সেগুলো সামলানোর হ্যাপা যেমন এসে যায়, তেমনি ঘোরার আনন্দও কিছুটা ফিকে করে দিতে পারে। তাই চেষ্টা করবেন একমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিষ ছাড়া লাগেজ ভারি না করতে। কিছু ফার্স্ট-এইড কিট অবশ্যই সাথে রাখবেন, সঙ্গে দরকারী ওষুধপত্র। বেশী দামি জিনিষ, গয়নাগাটি নিয়ে বেড়াতে না যাওয়াই ভালো। অনেক স্ট্যানার্ড হোটেলে এখন লকারের ব্যাবস্থাও রাখে, খোঁজ নিয়ে রাখতে পারেন।

খাওয়া-দাওয়া

স্বচ্ছ দেখালেও কিছু জায়গার পানীয় জল কিন্তু ভাল মানের নাও হতে পারে, বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের। সেক্ষেত্রে সাথে জল পরিশোধক ওষুধ রাখা ভালো। মিনারেল ওয়াটারও ব্যাবহার করতে পারেন যদি সেটার সুবিধা থাকে। অবশ্যই বেড়াতে গিয়ে পেটের প্রবলেম চাইবেন না। জল বাদ দিয়ে অন্যান্য খাওয়া-দাওয়াও চেষ্টা করবেন স্বাস্থ্যকর জায়গা থেকে খেতে এবং অকারনে শরীর খারাপের ঝুঁকির মুখে না পড়তে। বেড়াতে বেড়িয়ে যথেষ্ট শারীরিক পরিশ্রমও হয়, তাই চেষ্টা করবেন হালকা খাবারের দিকে যেতে, এবং খুব মশলাদার না খেতে। তবে অবশ্যই জায়গা বিশেষে সেখানকার বিখ্যাত খাবার-দাবার চাখতে ভুলবেন না! পাহাড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মধ্যে মধ্যে চেষ্টা করবেন যতটা সম্ভব গরম জল খাওয়া যায়, সে চা বা এমনি গরম জল যেরমই হোক না।

সাবধানতা

নিরপত্তার বিষয়টাকে বাদ দিকে ভ্রমন না করাই ভালো। বেড়ানোর সাথে সাথে নিরপত্তার বিষয়টাও মাথায় রাখা উচিত। যেখানে গাইডের প্রয়োজন সেখানে গাইডকে অমান্য করে কোন কিছু করতে যাবেন না। যদি নিয়মের বাইরে কোন কিছু করার ইচ্ছা হয়, পরামর্শ নিন আপনার গাইডের থেকে। মনে রাখবেন কোন একটা স্থান সম্বন্ধে আপনার থেকে আপনার গাইডই কিন্তু বেশী জ্ঞান রাখতে পারে। সবসময় অনুমোদিত গাইড-ই নেবেন, অনুমোদিত গাইডদের অভিজ্ঞতা বিষয়ে কিন্তু কোন গ্যারান্টী পাবেন না।

অচেনা জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য মানুষ বিনা বেশী রাতে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। দ্রষ্টব্য জায়গাগুলি দেখার সময় অযথা সময় নষ্ট করবেন না, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ে সব দ্রষ্টব্য দেখা হয়ে উঠবে না। সময়ানুবর্তীতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঘোরার ক্ষেত্রে। ট্রেন, বাস ইত্যাদিও সেই সময়ানুবর্তীতার মধ্যেই পড়ে। লম্বা সফরসূচী হলে মাঝে দু-একদিন বিশ্রামের জন্য রাখবেন।

কোন বিশেষ জায়গার যদি কিছু বিধি-নিষেধ থাকে তাকে সম্মান দেয়ার চেষ্টা করবেন। অকারনে নিজের জেদ রাখার জন্যে নিয়ম অমান্য করে কিছু করতে যাবেন না। এতে যেমন আপনার প্রতিচ্ছবি নষ্ট হবে তেমনি সেই জায়গাকে অসম্মানও করা হবে। বেড়ানোর ক্ষেত্রে দালালদের এড়িয়ে চলবার চেষ্টা করবেন। বেশীরভাগ সময়ে তারা দামের তুলনায় নিকৃষ্ট জিনিষটাই তুলে দেবার চেষ্টা করে।

সামনে থাকা ছবি

WYSIWYG ওয়ালপেপার। যেমন তোলা ৯৮% তেমনি পরিবেশন করা; চড়িদার রঙ ঢেলে বা কারিকুরি করে চোখ ধাঁধানো নয়।

কিছু বেছে নেয়া ছবি রইল BongTraveler’এর সংগ্রহ থেকে (Wide Screen 2560 X 1600) হাই রেসলিউস্‌নে নন-কমার্শিয়ল এবং ওয়ালপেপারের জন্য।

নিম্নে বর্নিত রইল ডাউনলোড ইন্সট্রাকসন। ভালো লাগলে খুশি হবো। 🙂

To get full-size image:
undefined

Bodh Gaya, in the Rise of Corona

ঠিক হয়েছিল দু’মাস আগেই, জানুয়ারির কোন এক সময়ে যাত্রা করার। এবারের গন্তব্য বুদ্ধ গয়া। উত্তর-পূর্ব বিহারে অবস্থিত বুদ্ধ গয়া বিশ্বের অন্যতম কিছু বৌদ্ধিক তীর্থস্থানগুলির মধ্যে একটি বলে মনে করা হয়। প্রাচীন মহাবোধি মন্দির এবং তার অংশজ মহাবোধি বৃক্ষ যার নীচে স্বয়ং বুদ্ধ বোধি লাভ করেছিলেন, এবং আরো কয়েকটি পবিত্র স্থান সহ বুদ্ধ গয়া।

ভাবনা অনুযায়ী জোগাড়যন্ত্র হয়ে গেছিল, অনলাইন খুঁজে একটা পছন্দসই হোটেলও বুকিং হয়ে গেল। হোটেল ডেল্টা ইন্টারন্যাশনাল, ওয়াট থাই বুদ্ধভূমির পাশেই খোলামেলা একটা হোটেল। দিন ঠিক হল জানুয়ারির শেষ সপ্তাহের শুক্রবার।

জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই জোর পেতে শুরু করেছিল চীন সীমান্তের ওপার থেকে ভেসে আসা COVID-19 বা Wuhan Virus এর আতঙ্ক। দিনে দিনে যার দ্বিগুণ থেকে তিনগুন সংক্রমন উদ্বেকের সৃষ্টি করেছিল এপারেও, যদিও ভারতে তখনও কোন সংক্রমনের খবর আসেনি কিন্তু অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার খবর আসতে শুরু করেছিল। এ দেশে চাইনীজ ভিসা খারিজের সাথে সাথে বিভিন্ন এ্যাডভাইসারি জারি করা হয়েছিল বিদেশ ভ্রমনের জন্য, যেমন কি কি করা উচিত আর কি না ইত্যাদি ব্যাপারে। চীন ফেরত দেশী/বিদেশী এবং অন্যান্য সংক্রমক দেশ থেকে আসা বিদেশীদের সম্পর্কেও প্রশাসন সতর্ক হয়ে উঠেছিল। সেই নিরীখে বুদ্ধ গয়া যেমন ভিনদেশীয় ভক্তদের এক পীঠস্থান, তেমনি সেইসব দেশগুলির মধ্যে এশিয়াটিক দেশের সংখ্যাই বেশি যাদের থেকে সংক্রমনের খবর আসতে শুরু করেছিল, থাইল্যান্ড, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি। এদেশিও থেকে কিছুটা বিদেশীয় তীর্থস্থানই বেশি বলা চলে। আমাদের যাত্রার সময়ও ধ্যার্য হয়েছিল যখন চীনে এই ব্যাধির সংক্রমন চূড়ান্তে।

কিছুটা দোনোমোনোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যাত্রার। তাছাড়া অপেক্ষাও করে ছিলাম অনেকদিনই, তাই এত সামনে এসে ভেস্তে দেয়ার মনও চাইল না। যদিও সংক্রমনের ভয় রইলই। অতঃপর কিছু নিয়মকে সঙ্গ করে আর একটা ভয়কে ঘাড়ে নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। মাঝে থাকল লম্বা বোরিং সফর আর রাস্তা, যদিও ড্রাইভিং আমার নেশা কিন্তু রাস্তার রসকস্‌হীনতায় সেটাও ফ্যাকাশে লাগতে লাগল একসময়।

এ রাস্তাতে আমি আগেও এসেছি। মূলতঃ পুরুলিয়া, গরপঞ্চকোট ইত্যাদি যা বাংলার সীমানা পর্য্যন্ত। কিন্তু এবারে বাংলার সীমান্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসা, এবং তারপরেই খুব ধাক্কা খেলাম রাস্তার অবস্থা দেখে যা আমাদের যাত্রার আপেক্ষিত সময়কে ধাক্কা পৌঁছাতে শুরু করেছিল। সংস্লিষ্ট রাজ্যের সরকারদের যারপরনাই মুন্ডপাত করতে করতে আমরা এগিয়ে চললাম। ভাঙা রাস্তা, ট্রাক, ধুলো আর বিভিন্ন কলকারখানার ধোঁয়া আমাদের সঙ্গী হয়ে রইল।

দুপুর গড়িয়ে বিকালের পড়ন্ত আলোয় যখন ধোবি এসে পৌঁছলাম তখন আলো অনেকটাই কমে এসেছে, শীতের দিন এমনিতেই ছোট হয়। হাইওয়ে ছেড়ে এক সরু বাস রাস্তায় নেমে এলাম যেখান থেকে আমাদের হোটেল আরো আধ-ঘন্টার পথ। উঁচু রাস্তা থেকে দুপাশে নিচ নেমে যাওয়া জমিতে বাচ্চারা খেলছে, বসতি দোকানপাট ইত্যাদি। কিছুটা দূর যাওয়ার পরই সেই রাস্তা এতটাই খারাপ হয়ে গেল যা হোটেলের আগে অবদি ঠিক হল না। বড় বড় গর্ত, ছাল-চামড়া উঠে মাটি বেরিয়ে থাকে; শিউরে ওঠার মত ছিল যেখানে ভাঙনের দৈর্ঘে ভারী গাড়ি হেলেদুলে পার হচ্ছে। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে সেই রাস্তা পার হতে মোটামুটি এক ঘন্টা লেগে গেল। যখন হোটেলের চৌহদ্দিতে গিয়ে পৌঁছলাম তখন অন্ধকার নেমেছে।

পরে জেনেছিলাম সেখানে সিক্সওয়ে লেন হচ্ছে। তবে তার আগে রাস্তার এই হাল অনেকেই স্বীকার করে নিলেন।

সেদিন রাত্রে সাময়িক আহারাদির পর বেরিয়ে পড়লাম তিবেতা্‌ন রিফিউজি মার্কেট ঘুরে দেখতে। মহাবোধি মন্দিরের সংলগ্ন এলাকায়, ওয়াট থাই মন্দিরের কাছাকাছি এই রিফিউজি মার্কেট। পরের দিন অনেক কিছু ঘোরার থাকায় রিফিউজি মার্কেটের পাট’টা এই সন্ধ্যেতেই সেরে নিতে চাইলাম। হোটেলের সামনের মোড় থেকে একটা টোটো চেপে সোজা রিফিউজি মার্কেটের মুখ অবদি যাওয়া। যাঁরা নতুন এবং পুরাতন দীঘার মাঝের দূরত্ব এবং দৃশ্যাবলী দেখেছেন, তাঁদের হয়ত বুঝতে সুবিধা হবে এই হোটেল আর মন্দির সংলগ্ন এলাকার দূরত্বটি।

তবে মার্কেট ঘুরে আশাহত হয়েছিলাম কারন সেখানে তিবেতান জিনিষপত্রাদির থেকে পোশাকআশাক-এরই মূলত সম্ভার। যাই হোক, মার্কেট থেকে বেরিয়ে রাস্তার ওপারে চলতে থাকা একটি মেলায় কিছুক্ষন কাটালাম এবং তারপর হোটেলের পথ ধরলাম।

সেরাত্রে আর কোন মন্দির/মনেস্ট্রি ঘোরার ছিল না। এখানের মন্দিরগুলি সকাল ৭ঃ০০ টা থেকে ১২ঃ০০ টা পর্য্যন্ত খোলা থাকে, এবং আবার দুপুর ২ঃ০০ টা থেকে ৫ঃ০০ টা পর্য্যন্ত। রাত্রে হোটেলে এক পরিতৃপ্ত আহারাদির পর শান্তির ঘুম।

পরের দিন

বিহারের ঠান্ডা হাড়ে বেঁধার মত, কোলকাতার মত জোরো-ন্যাকা ঠান্ডা নয়। এরকম ঠান্ডা তা বহুদিন পরেই অনুভব করলাম! এই সময়েও এখানের ঠান্ডা এতটাই কিটকিটে ছিল যখন কোলকাতার ঠান্ডা প্রায় যাবার মুখে। হোটেলের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর খোলামেলায় আমরা সবাই খুশি, আর এই প্রথম বোধহয় কোথাও বেড়াতে গিয়ে হোটেলে একবারের জন্যও টিভির প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। হোটেলের চৌহদ্দির মধ্যে পর্যপ্ত পার্কিং স্পেস, হাঁটার জায়গা, ঘাসে মোড়া লন (যা ছেলের ছোটাছুটির জন্য আদর্শ ছিল), রসনা তৃপ্ত করা খাবারের আয়োজন এবং একজন বড়ই সাহায্যকারী ওয়েটার (মাঝে মধ্যে তো নিজেদেরই কিরম অস্বস্তি লাগছিল তাঁর সাহায্যের ঠেলায়) কিন্তু ভালো মানুষ।

চাদর-সোয়েটারে নিজেদেরকে মুড়ে আটটা নাগাদ সকালের জলখাবার সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বুদ্ধ গয়া ভ্রমনে। সাথে রইল হ্যান্ড স্যানিটাইজ্‌র আর মাস্ক – সবাইকে একরকম বাধ্যই করলাম মাস্ক ব্যবহারের জন্য। চাইছিলাম সবাই যাতে বুঝুক এই সময়ের গুরুত্বটাকে, যদিও সবথেকে বেশি বোধহয় অসুবিধা হয়েছিল আমার ছোট ছেলেটিরই। কিন্তু আমি কোন ঝুঁকি নিতে চাইছিলাম না, বিশেষ করে বুদ্ধ গয়ার মত ভিন্‌ দেশীয়দের ভিড়ে।

হোটেলের সামনে দিয়ে আবার একটা টোটো নিয়ে হাজির হলাম মন্দির এলাকায়, গতকাল এখানেই নেমেছিলাম রিফিউজি মার্কেটে যাবার জন্যে। মূল রাস্তা ট্রাফিক ব্যারিকেড দিয়ে আটকানো যার ওপারে টোটো, চার-চাকা নিষিদ্ধ (যদিও ওপার থেকে আসা সীমিত পরিবহন চোখে পড়ল), আর ওই রাস্তাই চলে যাচ্ছে মহাবোধি মন্দিরের দিকে, পথিমধ্যে অন্যান্য মন্দির/মনেস্ট্রিও পড়ে। তবে আমাদের এখনই অপরপ্রান্তে যাবার ছিল না, রাস্তা পেরিয়ে ডানদিকে অপেক্ষাকৃত সরু পথ ধরলাম।

ভিন্‌ দেশীয়দের ভিড় এখান থেকেই চোখে পড়ার মত ছিল। বিভিন্ন এশিয়াটিক দেশের লোক। একটা বড় অংশ বিভিন্ন বয়সী লামাদের ছিল। অলিতে-গলিতে, রাস্তায় দোকানে তাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেতে লাগল।

এই সরু রাস্তাই সোজা চলে যায় গ্রেট বুদ্ধ স্ট্যাচু মন্দিরে। সরু রাস্তার অলিতে-গলিতে আরো ছোট-মধ্য সাইজের মন্দির/মনেস্ট্রি, মঙ্গোলিয়ন মন্দির, কার্মা মন্দির ইত্যাদি অবস্থিত। মাঝে মধ্যে জায়গাটিকে বিহারীয় কম মনে হতে পারে, যদিও লোকাল এবং ভিনদেশীয় কালচার সমানভাবে গড়ে উঠেছে।

পাঁচ মিনিট হাঁটতেই আমরা পৌঁছে গেলাম গ্রেট বুদ্ধ স্ট্যাচু মন্দিরের সামনে। কিছু হকার্স স্টল পেছনে ফেলে সুসজ্জিত গাছে ঢাকা লন্‌ দিয়ে এগিয়ে গেলাম বিশালাকায় ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ মূর্তির সামনে, সকালের রোদ্দুরে তখন প্লাবিত হচ্ছে চারিপাশ। ৬৪ ফুট অতিকায় বুদ্ধ ধ্যান মুদ্রায় উঁচু বাতাসে একটি পদ্মের উপর বসে রয়েছেন। সাত বছরের পরিশ্রমের ফসল এই মন্দির ১৯৮৯ সালে দালাই লামা কতৃক উদ্বোধিত। ভগবানকে ঘিরে আছেন আরো ছোট ছোট মূর্তি যাঁদের মধ্যে সরিপুত্র, সুভুতির মত প্রিয় শিষ্যরাও আছেন। বিশাল মার্বেলের বেদী যার ওপর ভগবান বসে আছেন চক্রবর্তকারে ঘোরা যায় তাঁকে। একদল ইন্দোনেশিয় ভক্তেরও সমাগম এমুহূর্তে, একজন গাইড ছোট মাইকে বুঝিয়ে যাচ্ছিলেন জায়গাটির গুরুত্ব। অধিকাংশ ভক্তেরই মুখে মাস্ক তাও কিছুটা আশঙ্কা রেখে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চললাম, এই ভাইরাসের আবহে।

সকালের রোদ্দুরে প্লাবিত হচ্ছে চারিপাশ।
৬৪ ফুট অতিকায় বুদ্ধ ধ্যান মুদ্রায় বসে রয়েছে।
মার্বেল বেদী যার ওপর ভগবান বসে আছেন চক্রবর্তকারে ঘোরা যায় তাঁকে।
সরিপুত্র, সুভুতির মত প্রিয় শিষ্যরা ভগবানকে ঘিরে আছেন।
দুপাশে সজ্জিত গাছে ঢাকা লন্‌ দিয়ে এগিয়ে বিশালাকায় ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ মূর্তি।

ভগবান বুদ্ধের স্নিগ্ধতাকে আহরন করতে করতে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে, পালয়ুল নামদ্রোলিং মনেস্ট্রি। একটু এগিয়ে বাঁয়ে ঘুরলেই মনেস্ট্রির বিশাল তোরন নজরে আসে। সুসজ্জিত বাঁধানো রাস্তা, যত্নের সাথে সংরক্ষিত বাগান, এবং বিশালাকার জায়গা নিয়ে এই মনেস্ট্রি। একটু ঢুকলেই নজরে আসে রঙিন এবং সুন্দর করে সাজানো এক (বৌদ্ধ)স্তূপ।

রঙিন এবং সুন্দর করে সাজানো (বৌদ্ধ)স্তূপ।
যত্নের সাথে সংরক্ষিত বাগান।
সীমানার বাইরে চারিপাশ।

মনেস্ট্রির খোলামেলা শান্ত পরিবেশে মুহূর্তেই হারিয়ে গেলাম আমরা। রোদের আলোয় স্ফটিকের মত স্বচ্ছ লাগছিল জায়গাটিকে। কোথাও বসে অনেকক্ষন কাটিয়ে দেয়ারও কোন অসুবিধা ছিল না এরম পরিছন্নতায়। ভিড় সেভাবে ছিল না, কিছু পর্য্যটক আর লামাদেরই যা চোখে পড়ছিল, আর নৈশব্দ।

রোদের আলোয় স্বচ্ছ সুন্দর লাগছিল জায়গাটি।
কোথাও বসে অনেক্ষন কাটিয়ে দিতেও কোন অসুবিধা হত না।

সোনালী-রঙে রঞ্জিত চূড়াওলা মনেস্ট্রির দেওয়ালে আর পাঁচটা মনেস্ট্রির মতই অসংখ্য রঙিন অলঙ্করণ। তিনটে বড় মূর্তির সাথে ১০০০টি ছোট বুদ্ধ মূর্তি এখানের আকর্ষণ। পরিমিত বৈদুতিক আলো আর খিলান থেকে ছিটকে আসা সূর্য্যের আলো ভেতরে এক মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।

তিনটে বড় বুদ্ধ মূর্তির সঙ্গে ১০০০টি ছোট বুদ্ধ-মূর্তি এখানের আকর্ষণ।
দ্বিতীয় বড় মূর্তি।
তৃতীয় বড় মূর্তি।
১০০০টি ছোট ছোট বুদ্ধ মূর্তি।
বৃহদায়তন দরজার তাগড়াই কড়া।

বাইরে ইতিমধ্যে রোদও চড়তে শুরু করেছে। আমরা বেরিয়ে পড়লাম পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে ঘুরে নিলাম কার্মা মন্দির, দ্যজোকো বুদ্ধিস্ট মন্দির ইত্যাদি।

ইতিমধ্যে বাইরে রোদও চড়তে শুরু করেছে।

মূল রাস্তায় যখন উঠে এলাম তখন চারিদিকে সরগরম বাজার। রাস্তার বাঁ দিকে যেমন বহু দোকানপাট রেস্টুরেন্ট খুলতে শুরু করেছে, ডানদিকের ফুটপাথ সেজে উঠছে হকারের লম্বা লাইনে, ছোট ছোট দোকানে হরেকরকম বুদ্ধগয়া স্পেশাল আইটেম। রাস্তার দুদিক দিয়ে অসংখ্য মানুষের হাঁটাচলা, এদেশীয় বিদেশিয়ো, বেটে লম্বা, ভক্ত পর্য্যটক, সব রকমেরি মানুষ। বড় রাস্তার ট্রাফিক ব্যারিকেড পেরিয়ে একটু এগিয়ে, রাস্তার ডায়ে সুসজ্জিত তোরণদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে, ওয়াট থাই টেম্পল

রাস্তার ডায়ে সুসজ্জিত তোরন।
থাই-চারুকলার প্রত্যক্ষ নিদর্শন।
দুপাশে দুই ভয়াল প্রহরী।

১৯৫৬ সালে থাই রাজতন্ত্র কতৃক প্রতিষ্ঠিত ওয়াট থাই টেম্পল থাই-চারুকলার এক প্রত্যক্ষ নিদর্শন। সোনার টাইলে আবৃত ঢালু ও বাঁকা ছাদে থাই স্থাপর্য্য দেখবার মত। তার সাথে সুক্ষাতিসুক্ষ কাজ তো আছেই। দুপাশে দুটি ভয়াল ভয়ঙ্কর প্রহরীকে পেছনে ফেলে মঠের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালে ভগবানের একটি শান্ত খোদাই করা ব্রোঞ্জের মূর্তি চোখে পড়বে। তবে আমাদের সময়ে মঠের ভিতরে প্রবেশাধিকার ছিল না তাই আর ভেতরের দর্শন হয়ে উঠল না। ভিতরের নীরবতা পেছনে রাস্তার কোলাহলের মধ্যেও পরিস্ফুস্ট ছিল।

ভগবানের একটি শান্ত খোদাই করা বিশালাকায় ব্রোঞ্জের মূর্তি।

দোরগোড়ায় কিছুক্ষন কাটানোর পর অগত্যা আবার ফিরতে হল জনবহুল বুদ্ধগয়ার রাস্তাতে। অগুন্তি মানুষের সাথে আমরাও পা মেলালাম। ডান পাশের ফুটপাথে উঠে আসতেই হকার্সদের হরেকরকমারি আকর্ষন করল। এরপর বিভিন্ন স্টলে বারবার না দাঁড়ানোই ভার হল। কতরকমের জিনিষপত্রাদি, তিব্বতীয়, বুদ্ধগয়া মোমেন্টোস, চোখ না ফেরানো যায় এরম তিব্বতী পেইন্টিং, ব্যাগ, খেলনাপত্রাদি, কি ছিল না সেখানে। একটা বড় সময় এইসব ছোট-ছোট জিনিষের সংগ্রহে অতিবাহিত করতে করতে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, চাইনীজ টেম্পল‘এর দিকে।

মূল রাস্তার ওপর পুরাতন তোরন।

মহাবোধি মন্দিরের কাছাকাছি চাইনীজ মন্দির। মূল রাস্তার ওপর তোরন পেরোতেই ভিতরে কিছুটা ফাঁকা স্থান, আর তারপরেই দুপাশের সিঁড়ি কিছুটা উঁচু প্রাঙ্গণে উঠে গেছে যেখানে মন্দিরের দরজা।

বৌদ্ধিক ভিক্ষুদের দ্বারা নির্মিত এবং ১৯৯৭ সালে সংষ্কৃত মন্দিরটি চাইনিজ স্থাপত্যের নিদর্শন রাখে। মন্দিরটি একটি ২০০ বছরের পুরাতন কৃষ্ণকায় বুদ্ধমূর্তির সংরক্ষন করে যেটি চীন থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং পবিত্র স্থান হিসাবে প্রতিষ্টিত করা হয়েছিল। এই মূর্তিটি বাদে আরো তিনটি সোনার বুদ্ধমূর্তি এখানে প্রতিষ্ঠিত। তবে আমাদের যাত্রাকালে এই মন্দিরের ভিতরেও প্রবেশাধিকার ছিল না, কেবল দরজায় দাঁড়িয়ে সেই তিন স্বর্ণমূর্তির যেটুকু দেখা যায়। শুনেছি ভিতরে বিভিন্ন ধর্মগুরুর লেখা অনেক প্রাচীন এবং দুস্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি, গ্রন্থ ইত্যাদি সংগৃহীত আছে।

তিন স্বর্ণমূর্তির যেটুকু দেখা যায়।

দেখার বেশী কিছু না থাকায় আমরা শীঘ্রই প্রস্থান করলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, মহাবোধি মন্দির

ভিড়ে পা মিলিয়ে হাজির হলাম মন্দিরের প্রথম প্রবেশদ্বারে। মূল মন্দির চত্বরের বাইরে বহু কোলাপ্সিবল গেট সম্বলিত প্রথম নিরাপত্তা বলয় এবং মন্দির চত্বরে ঢুকলে আরো একটি। অজস্র ভক্তের ভিড় ততক্ষনে প্রথম প্রবেশদ্বারের সামনে – পর্য্যটক, স্কুলের ছাত্রছাত্রী এবং ভিক্ষু সবাই লাইনে অপেক্ষায়। প্রথম প্রবেশদ্বারে ঢোকার আগে মন্দির সংলগ্ন কাউন্টারে জুতো, ফোন/ইলেকট্রনিক্স ইত্যাদি জমা দিতে হয়। টিকিটে স্থির এবং চলমান ফোটোগ্রাফির আলাদা চার্জ।

দ্বিতীয় চেকপোস্টে পৌঁছতে আরএক-প্রস্থ চেকিং চলল, জিনিষপত্রের এক্স-রেও হল। পাঠকগনকে এখানে বলে রাখি, ভুলেও কোন জিনিষপত্র নিয়ে এখানে হাজির হবেন না যা ইলেকট্রনিক্সের সমতুল্য। একটি ছোট রিমোট কন্ট্রোলড গাড়ি (আমার ছেলের) যা হ্যান্ডব্যাগে রাখা ছিল এবং প্রথম চেকপোস্টে তা আপত্তির কারন না হলেও দ্বিতীয়তে কোন মতেই তা নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হল না। এরপর কিছুটা নাজেহালই হতে হল আবার বেরিয়ে গিয়ে সেটা মোবাইল-জিনিষপত্রের কাউন্টারে জমা দিয়ে আসতে।

মূল মন্দিরের ব্যাস্ত প্রবেশপথে যখন এসে দাঁড়ালাম, গুচ্ছ গুচ্ছ সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে। সিঁড়ির শেষে প্রান্তে নিচু জমি থেকে বিরাজ করছে ৫০ মিটার উচ্চ মূল মন্দির। ভগবান বুদ্ধের জীবন সম্পর্কিত চারটি পবিত্র স্থানের মধ্যে এটি একটি। সেই গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়কাল থেকে ইঁটের তৈরী মন্দির এখনো দাঁড়িয়ে আছে আর সবাইকে অবাক করছে।

নিচু জমি থেকে উঠে এসেছে ৫০ মিটার উঁচু মূল মন্দির।

বুদ্ধগয়ার এই মন্দির চত্বরটি মূল মহাবোধি মন্দির, পবিত্র বোধি গাছ এবং অন্যান্য আরো ছ’টি পবিত্র স্থান নিয়ে গঠিত যার চারপাশে রয়েছে বহু ভোটিভ স্তূপ যা অভ্যন্তরীন, মাঝারি এবং বাহ্যিক সীমানা দ্বারা সংরক্ষিত। সপ্তম পবিত্র স্থান, লোটাস পুকুর, এবং মন্দির অঞ্চল – উভয়ই দুই বা তিন স্তরে প্রদক্ষিন করা যায়। বুদ্ধের বোধিপ্রাপ্তির সঙ্গে এইসব ভোটিভ স্তূপ এবং মন্দিরের প্রভূত সম্পর্ক রয়েছে, তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বোধহয় বোধি গাছে, যার তলাতে বোধি প্রাপ্তি করেন।

পুকুর এবং মন্দির উভয় অঞ্চলই দুই বা তিন স্তরে প্রদক্ষিন করা যায়।

মন্দির চত্বরের ভিড়ে আমরা শীঘ্রই হারিয়ে গেলাম। ভিন্ দেশীয়দের ভিড় সবথেকে বেশি। বিভিন্ন ছোটবড় দলে ভাগে হয়ে তাঁরা ভগবানের আরাধনা করছেন, মন্ত্রোচ্চারন করছেন অথবা দন্ডি কাটছেন। বৌদ্ধিক ধর্মে দন্ডি কাটার পদ্ধতিটি বেশ চমৎকার, শরীরের সর্ব অঙ্গের ব্যায়াম অবশ্যাম্ভাবী। ভিন্ দেশীয়দের উজ্বল পোশাকি ভিড়ের মধ্যে দিয়ে চলে যখন বোধি গাছের কাছে পৌঁছলাম ভক্তদের ছোট ছোট গোষ্ঠী বৃক্ষের চারিপাশ ঘিরে আরাধনায় মগ্ন। চিৎকার বা চেঁচামেচি নেই, যে যাঁর মত ভগবানকে তাঁদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন, প্রেয়ার হুইল ঘোরাচ্ছেন অথবা নিম্নস্বরে মন্ত্রোচ্চারন করছেন।

মন্দির চত্বরের ভিড়ে আমরা শীঘ্রই হারিয়ে গেলাম।
ভক্তদের ছোট ছোট টুকরো চারিপাশে আরাধনায় মগ্ন।
চিৎকার চেঁচামেচি নেই।
যে যাঁর মত ভগবানকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন।
মন্দিরে লাইন দিয়ে ভগবান দর্শন।

মূল মন্দিরে লাইন দিয়ে ভগবান দর্শন, এরপর হাঁটতে হাঁটতে একসময় পবিত্র লোটাস পুকুরের সামনে পৌঁছলাম। এখানের আবহাওয়া মনোরম। এপার-ওপারে দড়ি দিয়ে বাঁধা অজস্র প্রেয়ার ফ্লাগ পতপত করে উড়ছে পুকুরটির উপরে, ইতিউতি মানুষজন বসে আছেন সময় কাটাচ্ছেন, আর পুকুরের মাঝখানে বিশালকায় সর্পের ওপর বসে আছেন বুদ্ধ। জায়গাটিতে বসে পড়লে ওঠা দায়। তার সাথে বিভিন্ন মানুষের আনাগোনা ইত্যাদি দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে সময় কেটে যায় বোঝাই যায় না।

বিশাল সর্পের ওপর বসে আছেন বুদ্ধ।
চারপাশে রয়েছে বহু ভোটিভ স্তূপ।
বৌদ্ধিক ধর্মে দন্ডি কাটার পদ্ধতিটি বেশ চমৎকার।
মন্দিরটি চারিদিক প্রদক্ষিন করে বেরনোর পথ ধরলাম।

পুকুরপাড়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে মন্দিরের একবার প্রদক্ষিন করে আমরা বেরনোর পথ ধরলাম।

মোবাইল ইত্যাদি জিনিষপত্র পুনরায় সংগ্রহের পরে যখন রাস্তায় নামলাম তখন ঘড়িতে ১ঃ৩০ ছুঁইছুঁই। পেটে খিদেটা তখন বড়ই চন্‌চনে্‌। এবারের কাজ রেস্টুরেন্ট খোঁজা। অতঃপর চাইনীজ মন্দিরের পাশে একটি রেস্টুরেন্টের খোঁজও পাওয়া গেল, সিয়াম থাই। রেস্টুরেন্টটির নৈবিদ্যের বহর বেশ লম্বা, তবে মনে হল ভারতীয়দের তেমন পোঁছে না। যাই হোক, আমাদের নৈবিদ্যটি শেষ করে বেরিয়ে এলাম আবার রাস্তায়। একটি টোটো ভাড়া করা হল পরবর্তী দুটি স্থানে যাবার জন্যে, বলা যায় এ’যাত্রার এই দুটিই শেষ স্থান।

এখন অব্দি এখানের মানুষজনের ভিড়ে করোনা নিয়ে তেমন উদ্বেগ লক্ষ্য করলাম না। সিংহভাগ মানুষই মাস্ক ছাড়া ঘুরছে, গায়ে গা মিলিয়ে। হয়ত ভারতে এখনো এর প্রকোপ সেভাবে না পড়ায় মানুষজনের মধ্যে উদ্বেগের ভাগও কম। দেখলে হয়ত আমরা সেই কিছু সংখ্যক উদ্বিগ্ন মানুষ যারা সাবধানতা অবলম্বন করছি।

~

মূল রাস্তা ছেড়ে আরো গ্রাম্য রাস্তায় নেমে এলাম আমরা। ৫ মিনিটের মধ্যেই টোটো আমাদের নিয়ে গিয়ে ফেলল এবারের গন্তব্যে, মেটা বুদ্ধরাম মন্দির

সাদা রঙের প্রাচুর্য্যে সত্যিই আকর্ষনীয়।

বুদ্ধগয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মধ্যে এটি একটি। থাই স্থাপত্যের অপূর্ব শৈলীতে তৈরি মন্দিরের বাইরের বলয়ে স্টেইনলেস স্টিলের কাজ এবং সাদা রঙের প্রাচুর্য্যে কাঁচ বসানো মোজেইক, সত্যিই আকর্ষনীয়। মন্দিরের বাঁকা ছাদেও স্টেইনলেস স্টীলের রেখা। হাতে বানানো বহু ভাস্কর্য্য যা মূলত কাদামাটি, সাদা সিমেন্ট আর এপ্রোক্সির মিশ্রনে তৈরি। থরে থরে সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরের প্রাঙ্গণে যার শেষ প্রান্তে উঁচু বেদীর ওপর বসে আছেন স্বয়ং বুদ্ধ, শান্ত মুদ্রায় এক হাত উঁচিয়ে আশীর্বাদের ভঙ্গিমায়।

উঁচু বেদীর ওপর বসে আছেন স্বয়ং বুদ্ধ।
অনেকটা কোন হিন্দু দেবতার মত।

প্রাঙ্গণের উঁচুতে চারিদিক খোলা। এদিকটায় এখনো সেভাবে মানুষের বসতি গড়ে ওঠেনি। হাতে গোনা কিছু হোটেল, বাড়ি আর বহু খোলা ক্ষেতের জায়গা। দেখলে ভালো লাগল এরম একটা জায়গায় খোলা পরিবেশের মাঝে বসে আছেন বুদ্ধ। মূল মন্দিরের প্রবেশদ্বার এখানেও বন্ধ আমাদের জন্য।

প্রাঙ্গণের উঁচুতে চারিদিক খোলা।

বেশ কিছুক্ষন কাটিয়ে আমরা প্রস্থান করলাম আমাদের শেষ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে ক্লে’র তৈরি একটি বুদ্ধ বাগালাম সামনের হকার্স স্টল থেকে।

টোটোতে কয়েক মিনিটের পথ, কর্মপা মনেস্ট্রি। বেজায় বিরক্ত হলাম টোটোওলা যেভাবে রঙ চড়িয়ে দূরত্বের বর্ণনা দিয়েছিল দরাদরির সময়, তা না হওয়াতে। যাই হোক, কোন এক সংকীর্ণ রাস্তার আরো সংকীর্ন গলিতে হাঁটা পথে নেমে এলাম আমরা, এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই মনেস্ট্রির অনাড়ম্বর বিশাল তোরনের সামনে। বুদ্ধগয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ তিবেতান মনেস্ট্রি এটি যার আসল নাম টেরার(Terger) মনেস্ট্রি।

কর্মপা শব্দের অর্থ যিনি জ্ঞানের আলো প্রসার করেন। তিব্বতীয় মতে এইসব জ্ঞানদীপ্ত পুরুষেরা পুনর্জন্মে পারদর্শী এবং এঁরা ফিরে ফিরে আসেন মনুষ্য সমাজের কল্যানার্থে। কর্মপসরা তিব্বতে এই জাতীয় পুনর্জন্ম লামার মধ্যে প্রাচীনতম বংশবলী, ৯০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কর্মপসরা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কর্মফলু বংশের নেতা হিসাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমান এবং ১৭ তম কর্মপা, ওগেন ত্রিনলি দর্জে ১৯৮৫ সালে পূর্ব তিব্বতে জন্মগ্রহন করেছিলেন।

১৯৫০ সাল থেকে তিব্বত দখল করে থাকা চীনা সরকার যদিও প্রথম দিক কর্মপাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, কিন্তু যথেচ্চ নজরবন্দী এবং বড় অংশে কর্মপার কার্য্যক্ষমতাকে দমন করা হয়েছিল। এইসব বিধিনিষেধগুলি যেমন তরুন কর্মপার শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছিল, তেমনি অন্যান্য অনুরাগী ও শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছতেও। এরপর ১৯৯৯ সালে ১৪ বছর বয়সী কর্মপার চীন থেকে সাহসী পলায়ন সারা বিশ্বে বৌদ্ধিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ২০০০ সালে তাঁর ভারতে পদার্পন, দালাই লামা কতৃক অভ্যর্থনা এবং ভারতবর্ষের সরনার্থী মর্য্যাদা লাভ।

মনেস্ট্রির সাজানোগোজানো বাগান।
বুদ্ধগয়ার গুরুত্বপূর্ণ তিবেতান মনেস্ট্রি।

এরপর থেকে তিনি প্রতিবছর বুদ্ধগয়া আর সারনাথ ভ্রমন করেন এবং বার্ষিক কর্মকাগু অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন যা সারা বিশ্বের হাজার হাজার অংশগ্রহনকারীর কাছে আকর্ষনীয়। এই কর্মকাগু অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবার জন্যে এই মনেস্ট্রিকে কর্মপা মনেস্ট্রি বলা হয়ে থাকে।

মনেস্ট্রির সাজানোগোজানো বাগানে একটি ছোট কাফেটেরিয়া আর সুভেনিয়র শপ্‌ও আছে। চারিপাশে চক্কর কেটে যখন মূল মন্দিরে প্রবেশ করলাম সহজেই হারিয়ে গেলাম এর শান্ত নীরবতায়। বেশ কিছুক্ষন ঘুরলাম ছন্নছাড়াভাবে মন্দিরের আলো আধাঁরিতে, ছবি তুললাম, নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। যখন বেরিয়ে এলাম তখন দিনের পড়ন্ত আলোয় যেন আরো ভালো লাগল, এই জগতকে আমি চিনি।

হারিয়ে গেলাম মনেস্ট্রির শান্ত নীরবতায়।
ছবি তুললাম, নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কিন্তু এই জগত আমার না।

টোটোয় চেপে এরপরে হোটেলে প্রস্থানের পথ ধরলাম।

সন্ধ্যেবেলায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হল আর-একবার মহাবোধি মন্দির দর্শনের, সন্ধ্যের আলোয়। পাঠকগন ইচ্ছা করলে ঘুরে আসতে পারেন সন্ধ্যের সময়েও, এইসময় ভিড় অপেক্ষাকৃত কম থাকে এবং রাতের আলোয় ও পরিবেশে মন্দিরকে দেখতেও ভালো লাগবে। রাতে হোটেলেই ডিনার সারলাম এবং সেদিনের মত এক ব্যস্তবহুল দিনের পরিসমাপ্তি করা হল।

পরের দিন খুব ভোরে যাত্রা শুরু হল কলকাতার উদ্দেশ্যে। হোটেলের আগের আধা-ঘন্টার খারাপ রাস্তাও ছিল, ভিড় শুরু হওয়ার আগেই তা পেরোতে চাইছিলাম। এরপর সারাদিনের যাত্রার পর সন্ধ্যে সাড়ে’ছটা নাগাদ বাড়ি পৌঁছনো।

সঙ্গে রইল অনেক ভালো সময়ের স্মৃতি আর অনেক ছবি।

সমাপ্ত..

Road Trip – Chennai Return

যখন থেকে গাড়ি চালানো শিখতে শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই মনের কোনে দানা বাঁধতে শুুরু করেছিল উড়ে বেড়ানোর; বড়ই ভালোবেসে ফেলেছিলাম ড্রাইভিংটাকে। কালক্রমে ড্রাইভিংএ হাত পাকানোর সাথে সাথে এটা সেটা ট্রিপও সেরে ফেললাম রাজ্যের চৌহদ্দির মধ্যে, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এটা সেটা, সবই আমার ছোট আলটোয়। তার সাথে একটা সুপ্ত বাসনাও মনের মনিকোঠায় ক্রমশই দানা বাঁধতে শুরু করে, একটা বড় ট্রিপ করার। গাড়িতে, নিজে ড্রাইভিং করে, রোড ট্রিপ! ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিও থেকে মনের সেই সুপ্ত ইচ্ছার শুধু রসদ সংগ্রহই হতে থাকে, কবে নিজেরও একটা ট্রিপ হবে, রীতিমত রোড ট্রিপ।

ওপরের জনের ইচ্ছায় সেই শখও মেটানোর সুযোগ মিলেই গেল বলা চলে, যখন আমার নেক্সট বড় গাড়ি কিনলাম। (বড় বলতে আবার সেরম বড়ও কিছু নয় যে ঢাঁক পেটানোর মত) কিন্তু একটু বড় আমার আগের আলটোর থেকে।

যাই হোক, সেই বহু জমিয়ে রাখা শখটা মেটাবার সুযোগ এসেই গেল। আট মাস আগে ছুটির আবেদনও করে দিলাম, আর তারপর খোঁজাখুঁজি – হোটেল বুকিং, রুট ম্যাপ ঠিক করাবার মত ইত্যাদি এক্সসাইটিং পক্রিয়ার শুরু।

শুরুতে ঠিক ছিল পাড়ি জমাব সুদূর দক্ষিন তটে অবস্থিত রামেশ্বরম পর্য্যন্ত। যদিও সময়ান্তে সেটা যে একটু বেশী উচ্চভিলাসী ইচ্ছা হয়ে যাচ্ছে সেটা আমরা বুঝেছিলাম। সময়, দূরত্ব সবই তার মধ্যে সামিল ছিল। অনেকেই যাঁরা লম্বা সফরের রোগী, তাঁরাও পরামর্শ দিলেন সময়ের অনুপাতে একটু বেশিই (যদিও অসম্ভব নয়)। তবে হ্যাঁ, ভ্রমনের স্বাদ নিতে একটু থামারও প্রয়োজন।

দু’সপ্তাহের ছুটি, যাত্রী তিন জন – আমি, স্ত্রী এবং আমাদের বছর চারের পুত্র সন্তান। অবশেষে নানান মতামত, পরামর্শ এবং সময় ও সুযোগের ভিত্তিতে ঠিক হল চেন্নাই পর্য্যন্ত যাবার, এবারের মত। একটা রাউন্ড ট্রিপ – কোলকাতা to চেন্নাই to কোলকাতা। চারটে বড় রাজ্য, মাঝখানে ছোটবড় অগুনতি শহর, মনের আলহাদ বাঁধ মানছিল না যখন পুরো রুট প্লানের ম্যাপিং শেষ হল। অতঃপর ঠিক হল এই ভাবে :

১ম দিন: যাত্রা শুরু: কোলকাতা to ভুবনেশ্বর

২য় দিন: ভুবনেশ্বর to ভাইজা্‌ক

৩য় দিন: ভাইজা্‌ক শহর পরিক্রমা

৪থ দিন: ভাইজা্‌ক to ভিজয়ওড়া

৫ম দিন: ভিজয়ওড়া to চেন্নাই

৬ঠ দিন: চেন্নাই শহর পরিক্রমা ১

৭ম দিন: চেন্নাই শহর পরিক্রমা ২

৮ম দিন: ফেরা: চেন্নাই to ভিজয়ওড়া

৯ম দিন: ভিজয়ওড়া to ভাইজা্‌ক

১০ম দিন: ভাইজা্‌ক to আরাকু (এবং পরিক্রমা)

১১ম দিন: আরাকু to শ্রীকাকুলম

১২ম দিন: শ্রীকাকুলম to পুরি

১৩ম দিন: বিশ্রাম (কলহপ্রবন জীবনে ফেরার আগে একদিনের কাঙ্খিত থামা)

১৪ম দিন: পুরি to কোলকাতা

আর এর পরে শুধু অপেক্ষা করা। এপ্রিলের মধ্যেই মোটামুটি মূল কাজগুলি সারা হয়ে গেছিল, যেমন হোটেল বুকিং ইত্যাদি। হাতে এখনও চারটি মাস। যে যাই বলে কান বন্ধ করে মুখে হাসি রেখে মাথা গুঁজে কাজ করে যাও, শুধু সেই দিনটার অপেক্ষায়; আর তারপর আমিও লবডঙ্কা দেখিয়ে কাটব।

অতঃপর সময়ের নিয়মে যাত্রার সপ্তাহও এসে গেল। ধীরে ধীরে বাক্স-প্যাঁটরাও সেজে উঠতে থাকল। যাত্রার আর তিন দিন বাকি।

দিনটা ছিল ১৬ই আগস্ট, ২০১৯, শুক্রবার। হাতে মোটে আর একটা দিন। বর্ষার সময়, কিন্তু সেই সপ্তাহে বর্ষার সেরম একটা প্রকোপ ছিল না। সকাল থেকেই আকাশের মুখ একটু ভার ছিল তবে ঘুনাক্ষারেও বোঝা যাচ্ছিল না কি আসতে চলেছে।

দুপুর তিনটের সময়ে আকাশ ঘনিয়ে এল কালো মেঘ। মেঘের ভিতরে বিদ্যুতের মুহুর্মুহূ ঝলকানি দেখে মনে হচ্ছিল কিছু হতে চলেছে। মুশলধারে বৃষ্টি নামল এর পর, আর সেই যে শুরু হল পরের দিন সকালের আগে থামার নাম নিল না। সময়ে বেগ কিছুটা হালকা হলেও ক্রমাগত ঝরেই যাচ্ছিল। এত বৃষ্টির পর যা হবার আশঙ্কা থাকে, আমাদের উঠোনে থইথই করতে লাগল হাঁটু ডোবা জল। বাড়ির দোরগোড়া থেকে জলের রাশি যতদূর অব্দি রাস্তার বাঁক দেখা যায়। আমাদের কারোরই বুঝতে বাকি রইল না একটা অঘটন ঘটে গেছে, আমাদের যাত্রার নিরীখে।

বাইরে বেরিয়ে এসে যখন থই থই বাস রাস্তায় হাঁটু ডোবা জলে দাঁড়িয়ে আছি, তখন হয়ত বুকের মধ্যে দুমড়ে মুচড়েও উঠেছে এক বাঁধ ভাঙ্গা কান্না, স্বপ্নগুলোকে ডুবতে দেখছিলাম। বৃষ্টি ‘থামলেও’ ক্রমাগত ঝরা বর্ষনের মত ঝিরিঝিরি ঝরেই যাচ্ছিল। সারা কোলকাতা ভাসছিল, চারিদিকে শুধু ভেসে যাওয়ার ছবি উঠে আসছিল tvর পর্দায়। আবহবিদরা ভবিষ্যতবাণী করছিলেন আরো দুদিন এরম চলতে পারে। আমাদের সব আশা-ইচ্ছা খোলা আর অসমাপ্ত সুটকেসগুলোর মত ছড়িয়ে পড়ে রইল।

দুপুরের দিক থেকে বৃষ্টি একটু থামল। আকাশ চাপ মতন হয়ে রইল যদিও। প্রশাসনও যেন উঠে পড়ে লেগেছিল এই সময়টুকুর সদ্‌ব্যাবহারের জন্য, চারিদিকে বড় বড় জেনেরেটর চালিয়ে জল বের করার কাজ ক্রমাগত চলতেই থাকল, আর সবাই আকাশের দিকে চেয়ে ক্ষীন মনে একটাই প্রার্থনা করতে লাগলাম, আবার না আসে।

সে রাতে আর বৃষ্টি আসেনি। আকাশ ছিল শান্ত, চুপচাপ। দুয়েকটা তারাও হয়ত বেরিয়েছিল, কিন্তু এমন শান্ত নীরবতাও যেন মনে কোথাও ভয় ধরিয়ে দেয়। যাই হোক, আমরা সে রাত্রে ভালো করে ঘুমাতে পারিনি। মাঝে মধ্যেই ঘুম ভেঙ্গে বাইরে চেয়ে দেখেছি যে বৃষ্টি এল কিনা, আর মনে মনে চেয়েছি এভাবেই থাক, এভাবেই থাক। সে রাত্রে প্রকৃতি আমাদের প্রার্থনা রেখেছিল।

ভোররাত্রের আলো ফুটতেই বাইরে গিয়ে হাজির হই। বাস রাস্তা এখনো কোথাও কোথাও নিমজ্জমান তবে অনেকাংশে জল শুধু দু’পাশের ঢালগুলিতে এসে থেমেছে। আকাশের মুখ এখনো ভার, গুরি গুরি বৃষ্টির সাথে ঠান্ডা হাওয়াও চলছে।

আমরা দু’জনেই (আমার স্ত্রী এবং আমি) একমত হলাম যে হলে এখনি আর নাহলে নয়।

হিচড়ে গলির জল উপচে ফেলে আমাদের চারপেয়ে দানবকে বাইরে নিয়ে এলাম, বাড়ির অদূরেই বাস রাস্তায় পার্ক করা হল। এবার শুধু লাগেজ তোলার পালা, বৃষ্টি তখন নিরবিচ্ছিন্নতার আকার নিয়েছে, গুরি গুরি থেকে ঝিরিঝিরি বর্ষনে পরিনত হয়েছে।

এর পরের আধা ঘন্টা শুধু দম না ফেলে ছোটাছুটির পালা। অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে থাকা সুটকেস/ব্যাগ (যা শেষ দু’দিনে গুছিয়ে উঠবার কথা ছিল) যেভাবে হোক গুছিয়ে, যতটুকু যেরম যা মনে পড়ে ব্যাগে ভরে গাড়িতে ওঠানোর পালা চলল। এর মধ্যে কতটা কি নেয়া হল বা নেয়া হলনা তা খতিয়ে দেখার সুযোগ রইল না, যতটুকু কম সময়ের মধ্যে রাস্তায় নেমে পড়া যায় সে চেষ্টাই চলল। তার মধ্যে এমন একটা জিনিষও ভুললাম যা আমাদের ট্রিপকে ভীষনভাবে প্রভাবিত করতে পারত। ঘরদোর অপেক্ষাকৃত আগোছাল অবস্থাতেই পড়ে রইল, স্যাঁতস্যাঁতে জিনিষপত্র এদিক ওদিকে ডাঁই করা, কোনরকমে সবাইকে গুছিয়ে নিয়ে মা’কে প্রনাম করে যখন গাড়ির সীটে উঠে এলাম সেমুহূর্তে হয়ত স্টীয়ারিংএ হাত দিয়ে হাতো কেঁপেছে.. বা আমি হয়ত একটু বেশিই কাব্যিক হয়ে পড়ছি এ মুহূর্তে।

ছিটিয়ে আসা জল গাড়ির উইন্ডস্ক্রীনে ধাক্কা মেরে যখন তারাতলামুখী ব্রীজে উঠে এলাম, তখন এক মিশ্রিত আনন্দ আর অবিশ্বাস কাজ করছে আমার মধ্যে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়া কয়েদীদের সঙ্গে হয়ত আমি সে অনুভূতির তুলনা করতে পারি। এক মিশ্রিত রোমাঞ্চের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল যখন দেখছিলাম আমার পাশের সীটে আমার পরিবার আর সামনে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া কালো পিচ রাস্তা, এক লম্বা সফর।

ওহ মা! আমি কোন কার্ড আনিনি সঙ্গে (debit/credit), উপলদ্ধিটা তখন হল যখন বাড়ি থেকে ৪/৫ কিমি এগিয়ে এসেছি। সম্বল খালি কিছু ক্যাশ দুজনের কাছে।

যাই হোক, সেযাত্রায় আমাদের আর পিছনে ফিরতে হয়নি। দেবদূতের মত শ্বশুর এসে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর একাধিক ক্রেডিট কার্ড আমাদের হাতে দিয়ে। না হলে সত্যি মুসকিল হত 🙂

এরপর আমাদের আর সেভাবে ‘ভাসন্ত’ কোলকাতার সামনা করতে হয়নি। মূল বাস রাস্তাগুলিতে জল সেভাবে ছিল না, আর কোনা এক্সপ্রেসওয়ে’ আশা স্বরূপ জল ছিলই না।

এবং, এভাবেই শুরু হল আমাদের বহু অপেক্ষাকৃত, রোড ট্রিপ!

তবে এবারে আর বেশি লেখায় নয়। অপরিপক্ক হাতে আমাদেরি তোলা কিছু চলমান ছবি এবং রাস্তার বিবরন রইল। এই এতটা পথ এত কিছু অভিজ্ঞতা, কত ছোট ছোট ঘটনা, খুব সহজে হয়ত তুলে আনতে পারব না, তবে চেষ্টা করব।

পৃথক দিনের হিসাবে একএকটি ভিডিও রইল, এবং সময়ের সাথে এই তালিকাও আপডেট হতে থাকবে, কথা রইল।

২য় দিনঃ ভুবনেশ্বর to ভাইজাক্‌

৩য় দিনঃ ভাইজাক্‌ ভ্রমন

৪থ দিনঃ বিজয়ওড়া থেকে চেন্নাই

ক্রমশঃ..

Can tell my Mother – V Ladakh’14

যখন চোখ খুললাম বৃদ্ধা তখন আমার দিকে চেয়ে আছেন। আমি একটু হাসলাম, দু’চারটে কথা বলার চেষ্টা করলাম ওঁনার সাথে। এর মধ্যে সুস্মিতা ফিরে এসেছে ইঞ্জেকশন আর ওষুধপত্রাদি নিয়ে। শুভ্রা গাউন পরিহিতা এক লাদাখী নার্স এসে আমাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে গেলেন। শুয়ে থাকতে বলা হল আরো আধ-ঘন্টা কোন চিন্তা ছেড়ে। ভাইয়াজিরাও অনেক্ষন এসেছেন, ওঁনাদের হয়ত আরও অন্য কোথাও যাবার ছিল, কিন্তু আমার জন্যে.. সত্যি কৃতজ্ঞ ছিলাম ওঁনাদের এতটুকু সাহায্যের জন্য। শুনলাম ওষুধ নিয়ে এসে সুস্মিতা মোটামুটি জোর দিয়েই ওঁনাদের ফেরত পাঠিয়েছে, আস্তে-সিস্টে আমরা ফিরে যেতে পারব বলে। ভাইয়াজি ওঁনার ফোন নম্বর দিয়ে গেছেন কোন প্রয়োজন হলেই যেন ফোন করি। সুস্মিতাকে দেখিয়ে বৃদ্ধাকে বললাম, আমার বউ। বৃদ্ধা মাথা নাড়িয়ে হাসলেন।

এরপর আরো কতক্ষন সময় পড়ে ছিলাম খেয়াল নেই। সুস্মিতা আমার পাশেই সারাক্ষন বসে ছিল। Poor girl. অনুতপ্ত লাগছিল ওর জন্যে, এলো ঘুরতে আর কি অভিজ্ঞতা লাভ করছে। নিজের ওপর হতাশ ছিলাম খুবই।

~

অক্সিজেন এবং ইঞ্জেকশনের যুগলবন্দী ভালোই কাজ করল বলা চলে, মাথা বেশ হালকা বোধ করলাম এরপর। আমাকে আবার ডাক্তারের চেম্বারে উপস্থিত করা হল আর একপ্রস্থ চেক্‌আপের জন্য।

এরমধ্যে ডাক্তারবাবু একবার ঘুরে গেছেন যে ঘরে আমি শুয়ে ছিলাম। সে সময় একটি কম বয়স্ক যুবককে নিয়ে এসে একটি বেডে শুইয়ে দেয়া হয়েছিল, কিছু সঙ্গীসাথীও ছিল; দেখে মনে হল ভিনরাজ্য দিয়ে আসা কর্মচারীর দল। ডাক্তারবাবু ছেলেটিকে চেক্‌আপের পর ওষুধ লিখে দিলেন, সঙ্গীদের মধ্যে থেকে একজন বোধহয় বলেছিল ডাক্তারবাবু আপনারাই কিছু দিয়ে দিন না এখান থেকে। ডাক্তারবাবু তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন তা শুনে। প্রচন্ড গজগজ করতে করতে যা কিছু বলে গেলেন তার সারমর্ম যা দাঁড়ায়, সেন্ট্রাল দিয়ে কোটা-মাফিক যা ওষুধ সাপ্লাই করা হয় তা সবাইকে বিলি করার জন্য অপ্রতুল। উঁনি তাঁর নিখুঁত হিসাব দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন কত শতাংশ কোটা কাদের জন্য মজুত, যার মধ্যে আর্মি আছে, ফরেনার আছে, আদিবাসীরা আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। খুব বিরক্তির সাথে বলত লাগলেন সব যদি বিলিই করতে থাকব, শীতকালে এখানে যখন রসদ আসা বন্ধ হয়ে যাবে – কোনরকম aids আসবে না, তখন আমাদের – লাদাখী মানুষদের কি হবে? যে সামান্য কোটা আছে তাতে চলবে (?), বিশাল একটা প্রশ্নচিহ্ন রেখে দিলেন বাকরুদ্ধ দলটির সামনে। খুব শক্তভাবেই প্রতিষ্ঠিত করে দিলেন যার যেরম দরকার বাইরের দোকান থেকে নিয়ে আসুন। আমরা দু’জনে বসে শুনে গেলাম ডাক্তারবাবুর সমস্ত বিরক্তিটুকু।

দ্বিতীয়বার চেক্‌আপের পর ডাক্তারবাবু বললেন এখন ঠিক আছে, আর যে ওষুধগুলো দেয়া হয়েছে আরো তিনদিন চলবে। ওঁনাকে সম্ভাষন করে আমরা লেহ্‌’র রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। বাইরে তখন সবে সন্ধ্যে নামছে। মরে বেঁচে ওঠা মানুষের মত হালকা বোধ করলাম নিজেকে। মাথার যন্ত্রনা হাওয়া, নিশ্বাস নিতে সুবিধা, বুক হালকা; দুপা লাফিয়ে নেবার মত আলহাদও হয়ত কিলবিল করে উঠেছিল। ফুর্তির সাথেই একটা শেয়ার ট্যাক্সি ধরে মেন-বাজারে এসে উপস্থিত হলাম। সুস্মিতাও একটু নিশ্বাস ফেলেছে আমাকে আবার ছন্দে ফিরতে দেখে।

মেন-বাজারে একটা পুরানো চাটের দোকান আছে, এক পাঞ্জাবী ভদ্রলোকের দোকান, সময়ে অসময়ে ভালো ভিড় হয়। ফুর্তির মারে ইচ্ছা হল ফুচকা খাবার। ঢুকে ফুচকার অর্ডার দেয়া হল, এরপর যতটা উৎসাহের সাথে অপেক্ষা করেছিলাম অতটাই হতাশ হলাম একটা মুখে তুলে। বাঙালী নোলার সাথে এ স্বাদ পরিচিত নয়। কখন থেকে জিব ব্যাস্ত হচ্ছিল কিছু টক-ঝাল খাবার জন্যে, কিন্তু সেই চাখার ইচ্ছাটাই পুরো নিভিয়ে দিল। ভেতরে কিছু মিষ্টি পুর, আর ডোবানোর জন্যে জলটাও যা দেয়া হয়েছে তা কলকাতার ফুচকার ধারেকাছে আসে না। এখন গদগদ হয়ে এতো অর্ডার করা হয়েছে খেতে তো হবেই, ফেলতে তো পারি না। তাই ইচ্ছা না থাকলেও যতটা হয় শেষ করা হল। এরমধ্যে দুটো ছোলা-বাটোরার অর্ডার হয়ে গেছে। ফুচকা মুখে দেবার পর প্রমাদ গুনতে লাগলাম কে জানে কি চমক অপেক্ষা করছে আবার সেখানে।

বাড়ি ফেরার পথে দুই ভদ্রলোকের সাথে দেখা হল গেস্টহাউসের। এঁনারা সব ভিন রাজ্যের বাসিন্দা কর্মসূত্রে এখানেই থাকেন একটা কি দুটো রুম নিয়ে এবং একিসাথে রান্না-খাওয়া, বহুদিন থাকার দরুন মোটামুটি লোকালও হয়ে গেছেন। তাঁরা ভাইয়াজী বা কারো কাছ থেকে শুনেছেন আমার অসুস্থতা নিয়ে, বেশ উৎকণ্ঠার সাথেই খোঁজখবর করলেন আমাদের। আন্তরিকতার সাথে বলেও রাখলেন যেন কোন প্রয়োজনেই ডাকতে দ্বিধা না করি, সে যত রাতই হোক। অস্বীকার করব না, ফরেন ল্যান্ডে এসে এরকম আন্তরিকতায় মন ভরে গেল। আমি তো চিনিও না এঁনাদের ভালো করে।

রুমে ফিরে এসে কিছুটা পরিশ্রান্ত লাগলেও ওষুধ থাকার দরুন চিন্তাটা কম ছিল। দুটো ছোলা-বাটোরার অনেকটাই বাড়তি হল। ওষুধ খেয়ে মোটামুটি রাতের মত ঘুম, নির্বিঘ্নেই কাটল রাতটা।

~

~ ২৫শে আগষ্ট ~

পরের দিন লেহ্‌ বেড়ানোর প্ল্যান স্থগিত করা হল। একদিনের জন্য হলেও একটু রেস্ট এমতবস্থায় ঠিক লাগল। একটু দিন গড়াতে বেরিয়ে কিছু জিনিষপত্র কেনা, বাড়িতে ফোন করা ইত্যাদি ছোটখাটো কাজ সারলাম, খুব একটা কিছু অসুবিধা মনে হচ্ছিল না এবার। ওষুধগুলো তাদের কাজ করছে, দুপুরে বাইরে গিয়ে লাঞ্চ আর তারপর একটু ইতিউতি ঘোরার প্ল্যান হল।

মেন্‌ মার্কেটের অদূরবর্তী একটি রেস্টুরেন্টে আছে, দোতলায় পরিষ্কার-পরিছন্ন, সেটায় গিয়ে উঠলাম আমরা। সেদিন নাকি সারা লেহ্‌’তে নিরামিষ, কারন জানলাম না। মেনু দেখে ভেজ বিরিয়ানী, মালাই পনীর আর ওমলেট অর্ডার করা হল। বিরিয়ানী দেখে দুজনেই কিনারা করতে পারলাম না সেটা কোন অংশে আমাদের চেনা কিনা। দু’টো বিশাল সাইজের ওমলেট আমাদের জন্য একটু বেশীই ছিল। বিলিংয়ের সময় অনেকটা খাবার পড়ে থাকতে দেখে ওয়েটার কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন খাবার কি ভালো হয়নি? ভদ্রতা রেখেই জানালাম এটা আমরা যেরম খেতে অভস্ত্য সেরকম নয়, এটা আমাদের কাছে অনেকটা পোলাওয়ের মত। ওয়েটার শুনে বললেন কিন্তু লাদাখে এরম বিরিয়ানীই হয়ে থাকে। কথা না বাড়িয়ে হেসে রেস্টুরেন্ট ত্যাগ করলাম।

হাতে অনেকটা সময় পেটও ভারি, দুজনে ইতিউতি ঘোরার সিদ্ধান্ত নিলাম। মেন্‌ বাজারের লাগোয়া একটি মনাস্ট্রিতে গিয়ে ঢোকা হল। বাজারের ভিড়ে বাইরে থেকে বোঝা যায় না, একটা নিচু গেটই মনেস্ট্রির সংযোগস্থল। দুপুরের নিঃঝুম পরিবেশ, বেশী ভিড় নেই, ইতিউতি কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পর্য্যটক, পুণ্যার্থী এবং ভিক্ষুরা। চারিদিক ঘুরে ভেতরে এসে বসলাম। বিশাল মেঝের কোন এক কোনা বেছে নিয়ে পেতে রাখা আসনে বসলাম। আমাদের সুদূর অপর প্রান্তে গুরু পদ্মসম্ভবা, গৌতম বুদ্ধ এবং আরো কিছু দেবতার মূর্তি ও ছবি। কতক্ষন বসে ছিলাম জানি না, মন্দিরের প্রশান্তি দুজনকেই কোথায় নিয়ে চলে গেছিল। কোন একসময় এক লাদাখি মহিলা এসে আমাদের পাশে বসেছিলেন। নিচু কন্ঠে অজানা কিন্তু পরিষ্কার শব্দে উঁনি প্রার্থনা করে গেলেন। কি ছিল জানি না সে প্রার্থনায়, কিন্তু বুকের মধ্যে যেন কিছু দুমড়ে মুচড়ে উঠল, চোখ ভরে গেল জলে।

শান্তি এবং সান্ত্বনা
DSC_0308

এরপর আরো কিছুক্ষন বসে, ছবি তুলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। হাতে এখনও অঢেল সময় দিন গড়াতে, একটা গাড়ি নিয়ে অদূরেই অবস্থিত লেহ্‌ প্যালাস দেখতে গেলাম। এটা আমাদের রুমের বারান্দা দিয়েও দেখা যায়।

টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকা হল। দুপুরের রৌদ্র ছায়ায় ধুলোময় প্যালাসকে যেন আরো বিবর্ণ লাগছিল। কিছু একটা প্রদর্শনী হচ্ছিল ভেতরে। কিছু ঘর নিয়ে লাইন দেয়া স্ট্যান্ডে ছবি অসংখ্য লেখা। হয়ত এই প্যালাসের ওপরই কিছু! পড়ার সেরম এনার্জি ছিল না। ছাদে এসে লেহ্‌ শহরের পড়ে থাকা বিশাল দৃশ্য উপভোগ করলাম। কিছু ছবি তোলা হল, আরো কিছুক্ষন পরে আমার জানা সর্টকাট দিয়ে হেঁটে মেন্‌ বাজারে নেমে এলাম।

পরের দিন লেহ্‌র সাইট-সীনের জন্য ভাইয়াজীর সাথে কথা বলে একটা গাড়ি ঠিক করা হল। সকাল ৯টায় আসার পতিশ্রুতি পেয়ে, বাইরে ডিনার সেরে আমাদের কুঠুরিতে ঢুকে পড়লাম। রাতটুকু ভালোই কাটল।

ক্রমশঃ..

সম্পূর্ণ সিরিজ – এখানে

Can tell my Mother – IV Ladakh’14

একটা সময় বাসটা কোথাও থামতেই আমি নেমে গেলাম অন্যান্যদের সাথে। বিকেলের আলো তখন চারিদিক ছুঁয়েছে। এখানটা একটু সমতল। কোন এক পাহাড়ি ভ্যালির সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। বাদামি পাহাড়ের সারির মধ্যে আঁকাবাকা রাস্তাটা মিশে গেছে, বিকেলের শেষ রোদ পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে আলোর খেলা খেলে যাচ্ছে।

যেখানে দাঁড়িয়েছি সেই রাস্তার পাশেই সরু নালা দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল স্বচ্ছ জল। গাড়ির খালাসী সেই জল নিয়ে গাড়ি পরিষ্কারের কাজে লেগে গেল। আমি জল দিয়ে নিজের মুখচোখ ধুয়ে নিলাম। বড় সতেজ লাগছিল পাহাড়ি ঠান্ডা জল মুখে পড়াতে, বাসের ক্রমাগত ঝাঁকানি থেকে বেরিয়ে এসে। আরো যাত্রীরা এরমধ্যে নেমে এসেছে। কেউ জলে হাত-মুখ ধুতে লাগল কেউবা প্রকৃতির শোভা নিহরনে ব্যাস্ত হল। কিছুক্ষন পর আমরা আবার চলমান হলাম, তবে এবারে অনেক সতেজ লাগছিল নিজেকে।

~

অবশেষে সন্ধ্যা ৬ঃ০০ নাগাদ আমরা লেহ্‌ বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছলাম। এরমধ্যে বাস আর একবার থেমেছিল, এবং আর এক বাস যাত্রী উল্টি করল। যাক আর একজন উল্টেছে, মনে মনে ভাবলাম।

যখন বাসস্ট্যান্ডে পৌছলাম দু’জনেই বিদ্ধস্ত। দিনের আলো তখনও আছে, তবে জার্নিতে দু’জনেই ক্লান্ত। রাকস্যাকটা পিঠে নিয়ে ট্রলিব্যাগটা টানতেও যেন বড় কষ্ট হচ্ছিল। শরীর আর বইছিল না, ছেড়ে বসে যেতে চাইছিল। একটা শেয়ার ট্যাক্সি ধরে মেন বাজারে এসে পৌঁছলাম। বিকালের আলো তখন কমতে শুরু করেছে, দোকানে দোকানে আলো জ্বলে উঠছে। মেন বাজার এলাকাতে রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলছে তাই গাড়ি একটা সীমানার পর আর ঢুকতে দিচ্ছে না, আমাদের মেন বাজারের মুখেই নেমে পড়তে হল। আবার লাগেজ নিয়ে ট্রলিব্যাগটাকে টানতে টানতে বাজারের পথ ধরলাম।

মনে হচ্ছিল পথ যেন শেষ হচ্ছে না। মাথা যন্ত্রনা আর ক্লান্তি নিয়ে সামান্য খাড়াই রাস্তাতেও জিনিষপত্র নিয়ে এগোতে কষ্ট হচ্ছিল। মোটামুটি ১০ মিনিটের মত লাগল Skitpo Guest House পৌঁছতে।

আগেরবার মান সিং ছিল, এবারে কে – ভাবতে ভাবতে গেস্ট হাউসের দরজায় এসে পৌঁছলাম। ততক্ষনে চারদিক মোটামুটি অন্ধকার হয়ে গেছে, এসে দেখলাম গেস্ট হাউসও অন্ধকার। ড্রইং-কাম-রিসেপসনের অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই বেরিয়ে এল কোন এক ছেলে। চাচাজীর খোঁজ করতে ওপরে চলে গেল, কিছুক্ষনের মধ্যে ভাইয়াজি নেমে এলেন। সম্ভাষন করলেন চিনতে পেরে। জানলাম লোডশেডিং চলছে আর চাচাজী গেছেন শ্রীনগর। রুমের কথা বলাতে বললেন আপনাদের রুমটা কাল পেয়ে যাবেন, আজকের রাতটা একটা সিঙ্গল রুমে একটু কাটিয়ে নিতে হবে। অগত্যা আমাদের মালপত্র নিয়ে উঠে আসতে হল সেই রুমটায় যেটাতে আমি গতবার সিংহভাগ সময় কাটিয়েছিলাম। সিঙ্গল হলেও রুম ছোট নয় বা বিছানাও, তবে হ্যাঁ সেরম আরামদায়ক নয়।

যাই হোক এক রাতের ব্যাপার, আর দু’জনেই এত ক্লান্ত যে একটু ফ্রেশ হয়ে স্যারিডন খেয়ে শুয়ে পড়লাম, খাবারেও সেরম কিছু রুচি ছিল না। রাতে ঘুমটা খুব একটা ভালো হল তা নয়, দুই তক্তপোশের জোড়ার উঁচুনিচু বড়ই বিরক্ত করল।

.

~ ২৪শে আগষ্ট ~

সকালের ঘুমটা ভাঙল একটা অস্বস্তির মধ্যে। আগের দিনের ধকল, আনফিট্‌নেস – বুঝলাম জ্বর মতন আছে। মাথা যন্ত্রনাও যেন পিছন ছাড়ছে না। একটা ক্রোসিন খেয়ে নিলাম যাতে নিজেকে ঠিক রাখা যায়, বিরক্তি লাগল নিজের শরীর নিয়ে।

বলাই বাহুল্য, ঘুরতে এসে আমার এই নতুন অবতার – সুস্মিতাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ওর অসহায়তা পরিষ্কার, ট্রিপেরও আর কোন কেয়ার ছিল না যদি আমি না সুস্থ থাকি। ওকে দেখে আরো বিরক্ত হয়ে পড়ছিলাম নিজের ওপর, রাগ হচ্ছিল যে কোথায় নিয়ে এসেছি আজ নিজেকে, কোন physical fitness নেই!

একটা ক্রোসিন আর স্যারিডন খেয়ে অপেক্ষায় রইলাম একটু সুস্থ বোধ করার জন্যে, কিছু পরে একটু বেরিয়ে মেন বাজারের দিকে গেলাম।

এখানকার রাস্তাঘাট মোটামুটি সবই চেনা। সকালের নরম রোদে বাইরের ব্যাস্ততা তখন শুরু হয়ে গেছে। মেন বাজারের ভাঙা রাস্তার পাশ কাটিয়ে দোকানে গিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র কিনলাম, বাড়িতে ফোন করলাম, একটা বইও কিনলাম (Holy Cow, an Indian adventure) সময় কাটানোর জন্য।

গেস্ট হাউসে ফিরে খোঁজ নিলাম কখন রুম বদলাতে পারব, বা কি হল।

সম্মতি পাওয়ার পর তিনতলার রুমে সিফট্‌ করার কাজ শুরু হল। দু’টো রুম চয়েসের মধ্যে দিয়ে একটা বেছে নেয়া হল – ধারের ঘর, ছোট হলেও দু’টো বড় জানলা আছে যার একটা টপকালে একটা ছোট বারান্দাও আছে। ড্‌বল বেড, অ্যাটাচড্‌ বাথ এবং টিভি। এরমধ্যে চাচাজীও ফিরে এসেছেন, এসে আমাদের খোঁজখবর করলেন, সুস্মিতার সাথে পরিচয় করানো হল, Wi-fi‘ এরও বন্দোবস্ত করে দিলেন।

এরপর চানটান সেরে দুপুরের দিকে বেরোন হল লাঞ্চের জন্য। গতকাল সেই এসে ঢোকার পর সুস্মিতার এই প্রথম বেরোনো লেহ্‌’র রাস্তায়। মেন-বাজারের ব্যাস্ততার মধ্যে দিয়ে সামান্য এগিয়ে অদূরবর্তী একটি রস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম আমরা। শরীরের অস্বস্তিগুলো বা যার জন্যেই হোক খাবার খুব একটা ভালো লাগল না। আমার অবস্থা বুঝে সুস্মিতাও সেরম চাপ দিল না, সামান্য খেয়ে দুজনে বেরিয়ে এলাম। পাশাপাশি নীরবে হেঁটে সামান্য উঁচু রাস্তা ধরে ফেরার পথ ধরলাম; বুঝতে পারছিলাম সেও চিন্তিত।

~

কিছুটা খাড়াই অথবা রোদ – যেটাই হোক, সামান্য হেঁটে ফিরতেও নিশ্বাস উঠে গেল। বারংবার দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছিল নিশ্বাস নেবার জন্যে। বুকে ক্ষীন ব্যাথা, অবশেষে ঘরে এসে যখন পৌঁছলাম বুঝলাম জ্বর বাড়তে শুরু করেছে। সঙ্গে বেশ মাথা যন্ত্রনা এবং নতুন সংযোজন বুকের চাপ, যা থেকে শ্বাস কষ্ট। জটিলতা ঘিরে ধরছিল ক্রমশঃ আমাকে। প্রচন্ডভাবে চাইছিলাম ঠিক হতে, নিজের জন্যে এবং সুস্মিতার জন্যে, এ ট্রিপটা ওর জন্যই রাখা ছিল; কিন্তু এখন ওকে দুশ্চিন্তা ছাড়া কিছুই দিতে পারছি না।

আবার একটা ক্রোসিন খেয়ে নিজেকে ঠিক রাখার কসরত শুরু করলাম। একটু শোবারও চেষ্টা করলাম যাতে ওষুধও কাজ করে এবং পরিশ্রমও না হয়। সুস্মিতা এদিকে আরো চিন্তিত হয়ে পড়ছিল, ওর অসহায়তা ওর দিকে তাকালে বোঝা যায়। আমি শুধু নিজের অবস্থাকে দুষছিলাম। কখন জানিনা একটু চোখের পাতা লেগে গেল।

কতক্ষন ঘুমিয়েছি জানি না, কিছুটা অস্বস্তির মধ্যেই ঘুম ভাঙল। বিস্বাদ মুখ, ভারি মাথা আর গা গরম নিয়ে দেখলাম তখনও দুপুরই আছে। সুস্মিতা ঘুমোয়নি। দু’জনে বসে আলোচনা করলাম বিকালের মধ্যে না কমলে আমরা ডাক্তারখানা থেকে ঘুরে আসব। সেটা হয়ত কোথাও দু’জনকেই একটু শান্ত করল। আমি সত্যি এই অস্বস্তির মধ্যে দিয়ে বেরোতে চাইছিলাম। যদিও একটা ব্যাপারে প্রমাদ গুনতে লাগলাম – দিনটা ছিল রবিবার, আশঙ্কা ছিল ডাক্তারের উপস্থিতি নিয়ে।

কোনমতে দুপুরটা কাটিয়ে বিকাল হতেই আমরা নিচে নেমে এলাম, শারীরিক অস্বস্তি নিয়েই রিসেপ্‌সনে বসে রইলাম। উদ্দেশ্য কারোর সাথে কথা বলে কোন ডাক্তারের খোঁজ পাওয়া। মান সিংহের জায়গায় যে নতুন ছেলেটি এসেছে তাকে সবকিছু বলাতে সে ভাইয়াজির খোঁজ করতে চলে গেল, শুনলাম তিনি বেরিয়েছেন। ডাক্তারের বিষয়ে ছেলেটিও বেশী কিছু বলতে পারল না। এসবের মধ্যেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যখন বসে আছি, ভাবছি কি করব, তখন বাইরে থেকে ছেলেটি ছুটে এসে বলল ভাইয়াজি বাইরে গাড়িতে বসে আছেন, আপনারা গিয়ে কথা বলে নিন। শরীরের উত্তাপ আর মাথা যন্ত্রনাতে এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে সুস্মিতা আমাকে বসিয়ে নিজেই ছুটল বাইরে। কিছুক্ষনের মধ্যে এসে জানাল ভাইয়াজি বলছেন আজকে কোন ডাক্তার নেই, প্রাইভেটেও কোন ডাক্তার এখন আসবে না; হাসপাতালে যেতে হবে। উঁনি বলছেন এখুনি ওঁনার সাথে আসতে। আমাদের না পছন্দের কোন ব্যাপার ছিল না, সুস্মিতা ছুটল রুমে ওর ব্যাগপত্র আনতে। এরপর আমাকে ধরে বাইরে নিয়ে আসা হল, ভাইয়াজি গাড়িতেই অপেক্ষা করছিলেন, আমাদের গাড়ি ছুটল অদূরবর্তী আর্মি হাসপাতালের দিকে।

SNM Hospital Leh, অদূরেই অবস্থিত লেহ্‌ শহরের একটি সেনা হাসপাতাল, গাড়িতে ১৫ মিনিটের পথ, ঢালু পথ ধরে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি।

বিকালের নরম আলোয় আমরা হাসপাতালে এসে পৌঁছলাম। এখানে ভাইয়াজির ভালো চেনাশোনা আছে বুঝলাম; চেকআপের কার্ড করানো হল, কিছুক্ষনের মধ্যে ডাক্তারের সামনে উপস্থিতও করা হল। ভাইয়াজি আর গাড়িতে আসা অন্য ভদ্রলোক বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

চেকআপের পর জানলাম একটু চিন্তা আছে, ডাক্তারবাবু বললেন আধঘন্টা অক্সিজেন নিন আর কিছু ইঞ্জেকশন। তার সাথে কিছু ওষুধও প্রেস্ক্রাইব করলেন। পরে লক্ষ্য করেছিলাম এর মধ্যে একটা ওষুধ যেটার সম্বন্ধে আমি আগেও শুনেছিলাম, গেস্ট হাউসে altitude sickness ‘এর কথা চলাকালীন অন্যান্যদের সাথে। পরে বুঝেছিলাম altitude sickness ‘এর জন্যে খুব কার্য্যকারী ওষুধ হিসাবে পরিচিত এখানে – Diamox 250 (recommended twice a day for 3 days).

হাসপাতালে একটা বেড দেয়া হল আমার জন্যে। মোটামুটি পরিষ্কার-পরিছন্ন ছোট হাসপাতাল। বাইরে কিছু মানুষ এখনো অপেক্ষারত ডাক্তারের ভিসিটিং আওয়ার্সে। পরিষ্কার সাদা চাদর পাতা একটি বিছানায় আমাকে আধ-শোয়া করে দেয়া হল। সুস্মিতা বেরিয়ে গেছে পেসক্রিপস্‌নের ওষুধ আনতে। এখানে রানিং কেসে হাসপাতাল থেকে কোন ওষুধ দেয়া হয় না, রুগীর লোকদেরই তার বন্দোবস্ত করতে হয়, ওষুধের দোকান অদূরেই রাস্তার ওপারে কোথাও। কিছুক্ষনের মধ্যে একজন হোম-ডাক্তার এসে আমার পেছনে রাখা একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারের ভাল্ভ খুলে আমার দু’ই নাকের মধ্যে একটা বাঁকানো নল আটকে দিলেন। “চিন্তা করবেন না, শুয়ে থাকুন আর নিশ্বাস নিতে থাকুন।” এরপর ভদ্রলোক প্রস্থান করলেন। গা ছেড়ে পড়ে রইলাম বিছানায়। অবস্থার এরম আকস্মিকতায় কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ়। উল্টোদিকের বেডে এক লাদাখী বৃদ্ধা বসে, হাতে স্যালাইনের নল আটকানো। চেয়ে ছিলেন আমার দিকে। রুমের মধ্যে আরো চারটে ফাঁকা বেড। আমি একটু চোখ বোজানোর চেষ্টা করলাম।

ক্রমশঃ..

Hospital

সম্পূর্ণ সিরিজ – এখানে

Can tell my Mother – III Ladakh’14

~ ২৩শে আগষ্ট ~

সত্যি বলতে এটা হয়ত ভুলই হয়েছিল যে আমি মানালি-লেহ্‌ রোড-ট্রিপ চয়েস করেছিলাম; এটা আকাশ পথেও হতে পারত। কিন্তু কোথাও সেই পরিচিত রাস্তাতে আবার ফেরার ইচ্ছা এবং সুস্মিতাকেও সেই রাস্তা দেখাতে চাওয়া – এ সিদ্ধান্তের পিছনে ছিল। বিতৃষ্ণাময় সত্য যে লাদাখ্‌ পৌঁছে ওখানেই দেখার জিনিষ এত আছে যে এই রোড-ট্রিপটাকে avoid করা যেতেই  পারত। আমি দুঃখিত যে আমি এই রাস্তাকেই  আবার বেছে নিয়েছি যখন গতবার শত অভিশাপে শাপিত করেছি এ রাস্তাকে এবং এ রাস্তায় আসার জন্য। এটাতো বটেই যে আমি ভুলে গেছিলাম সেই যন্ত্রনা-কষ্ট, আর এবারে যখন আমি আরো আন্‌ফিট।

ভোর ৩ঃ৪০ নাগাদ তৈরি হয়ে ব্যাগপত্র সমেত নিচে নেমে এলাম। ঠান্ডা খুব কন্‌কনে ছিল না, তাই পাকামি করে বার্মুডাই পরে রইলাম আর পায়ে স্যান্ডেল। বাইরের আলো তখনো সেভাবে ফোটেনি। রিসেপসনে এসে আমাদের ব্রেকফাস্ট প্যাক করে নিয়ে (যা প্যাকেজরই অন্তর্গত) এবার অপেক্ষা করা। দু’জনের কারোরই সেরম খাবার ইচ্ছা ছিল না। এর আগে রুম-টী দিয়ে আসা হয়েছিল।

বাইরে কিছুক্ষন অপেক্ষার পর লাগেজ লোড্‌ করা শুরু হল বাসের ডিগিতে। মোটামুটি সবাই বেশ ঠান্ডার জামাকাপড় পরিহিত। স্তব্ধ রাত্রির ঠান্ডার মধ্যেই লবির সামান্য আলোতে বাস বোঝাই শেষ হল, আমরাও যে যার পূর্ব-বরাদ্দ জায়গায় গিয়ে বসে পড়লাম আবার বাসের মধ্যে। ৪ঃ১০ নাগাদ বাস হোটেলের উঁচু ঢাল থেকে নেমে এল পাহাড়ি রাস্তায় এবং শুরু হল আমাদের দ্বিতীয় এবং শেষ দিনের যাত্রা, লেহ্‌’র উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, কেবল বাসের হেডলাইটের আলোয় অন্ধকার চিরে এগিয়ে চললাম আমরা। যাত্রীরা বাসের অন্ধকারের মধ্যে আরএক প্রস্ত ঘুমের সূচনা করল।

মাথা যন্ত্রনা একটা ছিল, কিছুক্ষনের মধ্যে এটাও অনুভব করলাম কি ভুল করেছি আমি। যদিও সব জানালা বন্ধ কিন্তু চলার সাথে ঠান্ডাও যেন ঢুকছে কোথা দিয়ে। গায়ে এটা-ওটা থাকায় সেরম অসুবিধা হচ্ছে না, কিন্তু নিম্নভাগের বার্মুডা-কেবল সত্যি অসুবিধায় ফেলেছে। মনে হচ্ছিল নিচ দিয়ে ঠান্ডা আসছে – কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম না কোথা থেকে। ক্রমশঃ-ঠান্ডা কিছুক্ষনের মধ্যে বেশ কন্‌কনে ঠান্ডায় পরিনীত হল। বলাই বাহুল্য, বুঝতে বাকি ছিল না কি ভুল করেছি আমি। ঈর্ষা হচ্ছিল অন্যান্য সিটের দিকে তাকিয়ে কি সুন্দর ঘুমোচ্ছে সবাই – আর আমি —

পায়ের কন্‌কনানি এরমধ্যে এমন জায়গায় পৌঁচেছে যে কি করব কিছু বুঝে উঠতে পারছি না; জামা-প্যান্ট-জীনস্‌ ইত্যাদি যা আছে সব পোঁটলায়, আর পোঁটলা গাড়ির ডিগিতে। গিয়ে অনুরোধ করব অন্ধকার রাস্তায় গাড়ি থামাতে সে কানকাটা সাহসও পাচ্ছি না, কেবল নিজের মুণ্ডপাত করা ছাড়া। পা তুলে সিটের ওপর বাবু হয়ে বসে নিজের শরীরের যতটা কাছে ঢুকিয়ে নেয়া যেতে পারে, নিয়ে কোনরকমে ঠান্ডা থেকে বাঁচার চেষ্টা করেছি। সুস্মিতাও বুঝলাম খুব অসহায় বোধ করছে আমার এই অবস্থা দেখে, কিন্তু বেশী কিছু সাথেও নেই দু’জনের মধ্যে শেয়ার করার জন্য। ক্রমশঃ খারাপ হতে থাকে রাস্তাও এদিকে শরীরের আগাপাস্তালা ঢিলে করার কাজে নেমে পড়েছে।

ধীরে ধীরে আকাশের গায়ে দিনের আলোর ছোঁয়া দেখা দিল। কোন এক নাম-না-জানি জায়গায় এসে বাস থামল। ঠান্ডায় কাবু হয়ে যাওয়া পা’দুটোকে ছাড়ানোর জন্য নেমে পড়লাম, কিছু খাওয়ারও দরকার ছিল, ওখান থেকে যে খাবার প্যাক করে দিয়েছিল খুব একটা রোচক নয়। এক ধু-ধু ভ্যালির মধ্যে কোন এক নোমাডিক ল্যান্ডে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। যেখানে বাস থেমেছে, তার পাশে কিছু বড়-ছোট তাঁবু; তাঁবুর সাথেই বসতবাড়ি, দোকান-পাট, রেস্টুরেন্ট। তাঁবুর ভেতর যথেষ্ট উষ্ণ এবং আরামদায়ক। এরি মধ্যে একটা তাঁবুতে সাজিয়ে রাখা বিছানায় আয়েস করে বসে দু’টো ম্যাগির অর্ডার দেয়া হল। বাইরেতে বেশ কন্‌কনে ঠান্ডা।

dsc_0242
নোমাডিক বিশ্রামস্থল
dsc_0245
ট্যুরিস্ট বাহন

এরমধ্যে একবার চেষ্টা করলাম গাড়ির খালাসীর সাথে কথা বলে কিছু জামাকাপড় বের করা যায় কিনা ডিগি থেকে। আমার আবদার শুনে ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হলেন, উল্টে কিছু জ্ঞানও দিয়ে দিলেন। আমি কথা না বাড়িয়ে তিক্ত মুখে ফেরার পথ ধরলাম, দোষটা আমারি।

গরম গরম ম্যাগির পর আবার বাস চলতে শুরু করল। রাস্তার ক্রম-নিম্নমান অবস্থা আমার ওপর আবার ভারি হতে শুরু করেছে।

লাঞ্চের জন্য বাস কোথাও থামতেই আমি নেমে পড়লাম। শরীরের সমস্ত অস্বস্তি যেন নির্বিসহ করে তুলেছে এই যাত্রাকে। খাওয়া তো দূরের কথা, নোমাডিক হোটেলগুলোর পেছনে কোথাও গিয়ে বমি করে এলাম। আমার অবস্থা আন্দাজ করে হোটেলের মহিলা (যাঁর হোটেলে এসে নেতিয়ে বসেছি) রসুন-গরমজল দিলেন, “খেয়ে নিন, সিক্‌নেসে সাহায্য করবে।” সেটা গলায় ঢেলে, এককাপ চা আরো ঢেলে ধন্যবাদ দিয়ে গাড়িতে উঠে আসি। আবার সেই ক্লান্তিকর যাত্রার শুরু। নিয়মমত একটু একটু করে জল গলায় ঢেলে যাচ্ছি যাতে অক্সিজেনের অভাব না হয়।

এদিকে শরীরের অবস্থা খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে বাসের ঝাঁকানির সাথে। রাস্তারও যেন শেষ নেই। দেখে ঈর্ষা বাড়তে লাগল অন্যান্যরা কেমন দিব্যি বসে আছে কিন্তু আমি! এর মধ্যে এটা একটা ভালো যে সুস্মিতা এখনও শক্ত আছে, যেখানে আমি ভাঙতে শুরু করেছি, ভেতর ভেতর। উল্টে আমাকে উজ্জিবীত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে একটানা, বুঝতে পারছি কতটা অসহায় বোধ করছে আমার এ অবস্থা দেখে।

dsc_0224
পরিচিত উপজাতির দল এখানের
উজ্জ্বল স্বচ্ছ দিন কেবল আমি ছাড়া

বাসের ঝাঁকানি আর শরীরের অবস্থা একটা সময় এমন জায়গায় পৌঁছল যে বাসে আর বসে থাকা যাচ্ছিল না। দরজার দিকে তাকিয়ে নিজের আবেগগুলো কোনরকমে আটকাচ্ছি, কারন দরজা খুলে ঝাঁপ এমুহূর্তে সম্ভব নয়। দীর্ঘক্ষন ছোট জায়গায় বসে থাকার জন্যে সুস্মিতাও এবার পিঠের ব্যাথার সম্মুখীন হচ্ছে। পিছনের খালি সীটে খানিক্ষন পড়ে থাকার চেষ্টা করলাম, বাসের ঝাঁকানি সেটাও করতে দিল না। পিছনের সীটে এ যেন আরো কষ্টকর। এর সাথে মুষড়িয়ে দেয়া মাথা যন্ত্রনা সঙ্গ নিয়েছে, গা গুলিয়ে উঠছে। অবশেষে একটা প্যাকেটের মধ্যে সব উল্টিয়ে দিলাম।

অপ্রস্তুত লাগছিল, কিন্তু অনেকেই এগিয়ে এল কোনভাবে সাহায্য করার জন্য। সুস্মিতা যতটা সম্ভব আমাকে আগলে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে যাতে আমি একটু ভালো বোধ করি।

ক্রমশঃ

সম্পূর্ণ সিরিজ – এখানে

Can tell my Mother – II Ladakh’14

HPTDC ‘এর অফিসে পৌঁছে ভারী ব্যাগগুলো রেখে বেরিয়ে পড়লুম অদূরে রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়িতে ওঠার আগে একটু পেট ভরা থাকা ভালো।

দু’জনের জন্য স্যান্ডউইচ্‌ আর কোল্ড কফি অর্ডার করলাম। ও একটু uneasy ফীল করায় ওর খাবারটা প্যাক করে নেয়া হল, এদিকে বাস ছাড়ার সময়ও এগিয়ে এল।

আমরা রেস্টুরেন্ট ছেড়ে HPTDC ‘এর অফিসে পৌঁছতে ভদ্রলোক বললেন আপনারা তাড়াতাড়ি যান, বাস ছেড়ে দেবে তো! আবার মালপত্র নিয়ে মানালির রাস্তা ধরে ছুটলাম আমরা বাসস্ট্যান্ডের দিকে। হাতে ৫/১০ মিনিটের মত সময় ছিল। যাই হোক, মোটামুটি নির্ধারিত সময়ই বাস রওনা দিল, ১০ ‘টায়।

ছোটখাটো চার্টাড বাস যেগুলো পাহাড়ের বাঁকে আদর্শ। মানালির সবুজ পাদদেশ ধরে আমরা ক্রমশঃ এগিয়ে যেতে লাগলাম, আরো ওপরে। ছোটখাটো বসতি, দোকান-পাট, কোথাও কোথাও কঠিন রাস্তাঘাট ক্রমশঃ ফেলে আমাদের বাস এগিয়ে চলল।

আমরা বাঁদিকে বাসের ঠিক মাঝ বরাবর দু’টো সীট নিয়েছিলাম। সামনের দিকে সীট নিলে আরো ভালো হত, সেটা পরে বুঝেছিলাম। বাসে মোটামুটি অর্ধেকের বেশী ভিড় ছিল, তারমধ্যে আবার বেশীরভাগ যাত্রীই বিদেশী। দম্পতি, পরিবার, এমনকি অ্যাডভেঞ্চারাস মা এবং পুত্র। পিছনের কিছু সীট ফাঁকা।

বেশ কিছুটা দূরত্ব অন্তর বাস থামতে থামতে এগিয়ে চলল। থামা বলতে ক্ষনিকের ব্রেক – কোথাও টিফিনের জন্য, কোথাও প্রাকৃতিক দৃশ্য আহরনের জন্য (নিয়মমাফিক অথবা যাত্রীদের উৎপীড়নায়)। রোটাং পাশের পর থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। মানালি থেকে অনেক উঁচুতে পাহাড়ের বর্ণ, বৈচিত্র, রূপ সেখানে আলাদা, পাহাড় এখানে আরো ছাল ছাড়ানো, মানালির মত সবুজে মোড়া নয়, পাহাড় এখানে আরো কর্কশ, কিন্তু কত বৈচিত্রে ঢাকা! বহুল texture, color সেইসব পাহাড়ের। কোথাও পাহাড় ঘন বাদামী, কোথাও গেরুয়া বা কোথাও ধূসর। মেঘ ভেসে চলেছে চূড়াগুলোর গা ছুঁয়ে। উজ্জ্বল দিনের আলোতে ভাসছে চারিদিক। ওপরে উন্মুক্ত নীল আকাশ, কোথাও বিন্দুমাত্র শ্লেষ নেই প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উজাড় করে দেওয়াতে, আকাশ এখানে স্বচ্ছ, নিচের মত কুয়াশায় ঢাকা নয়। মুহুর্মুহু বাঁক, সোজা নেমে যাওয়া খাদ, খর্বকায় পাহাড়ের গা, সবমিলিয়ে ট্রাভেলার্সদের এক ঐকান্তিক অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে যাওয়া।

dsc_0301
আলহা্‌দিত ট্যুরিস্ট
dsc01169_pano

(এখানে বলে রাখি যাঁরা নাক সেঁটকান Nano সম্বন্ধে, মারহি (3360 mt.)-এরও আরো ওপরে দেখলাম একটা উঠে গেছে। দেখে মনে হল লোকাল, তার মানে প্রায়ই ওপর-নিচ করে। অর্থাৎ অতটাও যে হেলা করার মত ইঞ্জিন, তা হয়ত নয়।)

মারহি’র বিশ্রামস্থল

রাস্তার বৈচিত্রময় একঘেয়েমিয়তা, continuous বাঁক আর খারাপ রাস্তা ক্রমশঃ প্রভাব ফেলতে লাগল আমাদের ওপর, ঢুলুনি রূপ নিল। একটা সময় দু’জনেই খানিক্ষনের জন্য চলন্ত বাসে ঘুমিয়ে পড়লাম।

dsc01160

বিকেল চারটে নাগাদ আমরা কিলং এসে পৌঁছালাম। চকচকে্‌ রোদ তখনো চারিদিক উজ্জ্বল করে রেখেছে। মনে হল গতবারের থেকে এবার তাড়াতাড়িই এসেছে কিলং’এ। এবারে বেশ বিকেল বিকেল আলো থাকতে থাকতেই এসে গেছি আমরা। এবারেও আমরা উঠে আসলাম সেই হোটেল চন্দ্রভাগাতে, HPTDC ‘এর সঙ্গে বোধহয় ব্যাবসায়িক চুক্তি এদের।

মেন্‌ রাস্তা থেকে কিছুটা ওপরে এই চন্দ্রভাগা হোটেল। সিঁড়ি দিয়ে একটুখানি উঠলেই পাহাড়ের গায়ে বেশ কিছুটা জায়গা নিয়ে এই হোটেল। এরমধ্যে সামনের অংশটা অনেকটা খোলা জায়গা নিয়ে বেশ কিছু তাঁবু খাটানো। মোটা ক্যাম্বিস কাপড়ের তাঁবুগুলো মোটামুটি সারা সিজ্‌নটাই হয়ত খাটানো থাকে। যেসমস্ত ট্যুরিস্টরা পথিমধ্যে এখানে উঠে আসে তাঁরা এই তাঁবু ভাড়া নিতে পারেন অথবা মেন্‌ বিল্ডিং’য়ের রুমও নিতে পারেন। মেন্‌ বিল্ডিংটি দু’তিন তলার এবং তাঁবুগুলোর বাদেই তার অবস্থান। HPTDC ‘র যাত্রীদের এখানে শেয়ারিং’এ তাঁবুতে রাত কাটানো এবং ডিনারের ব্যবস্থা, যা বাসের টিকিটের মধ্যেই ধরা থাকে। তবে যাত্রীরা কেউ চাইলে আলাদা করে বিল্ডিং’য়ের রুমও ভাড়া নিতে পারেন। আমাদের দু’জনকে একটা আলাদা তাঁবু দেয়া হল, সারির শেষ প্রান্তে। ভেতরে দু’টো সিঙ্গল ফোল্ডিং খাট, আর টিমটিমে একটি বাতি।

যেহেতু দিনের আলো কমতে হাতে বেশকিছুটা আরো সময় ছিল, একটু বসে জিনিষপত্র তাঁবুতে রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গতবার একটু অন্ধকার হয়ে গেছিল এবং একা ছিলাম বলে সেভাবে চারিদিকটা আর বেশী ঘুরে দেখা হয়নি। এবারে দু’জনে বেরিয়ে মূল রাস্তা ধরে ডাঁয়ে এবং বাঁয়ে দুদিকেই একটু ঘুরে নিলাম। অনেক নিচে একটা পাহাড়ি লোকালিটি। দু’জনে অনেক চেষ্টা করেও সেখানে নামার সহজ পথটা খুঁজে পেলাম না। ঘুরপথে অতটা এনার্জি নষ্ট করে নামার ইচ্ছাটাও পাচ্ছিলাম না; নামাটা সহজ ওঠার থেকে।

কিছুক্ষন এদিক ওদিক ঘুরে এসে রাস্তার ধারে হোটেলের নিচু পাঁচিলে বসে দু’জনে গল্প করে বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। পড়ন্ত রোদের চড়া তেজও ওইরকম জায়গায় অনুভব করা যাচ্ছিল। আমি হোটেলের মধ্যে গিয়ে কিছু চিপস্‌ আর একটা বিয়ার নিয়ে এলাম। একটু হতাশ হলাম খুব একটা চিলড্‌ নয় দেখে, কিন্তু যা আছে সব ওরকমই। আদ্ধেকের মত খেয়ে আমি বোতলটা ফেলে দিলাম। এরপর দু’জনে স্ন্যাক্স খেতে খেতে আর গল্প করতে করতে পাহাড়ি সন্ধ্যে নেমে আসা দেখলাম।

কিছুক্ষনের মধ্যেই গাঢ় অন্ধকারে চারিদিকটা ঢেকে গেল। হোটেলের অংশের মধ্যে দু’একটা টিমটিমে আলো শুধু বাইরের অন্ধকারকে ভেদ করবার দুর্বার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাঁবুগুলোর মধ্যে একটা করে মিটমিটে আলো যা তার গা ভেদ করে বাইরে আসছিল না। কেবলমাত্র মেন্‌ বিল্ডিং’য়ের মধ্যেই যা একটু আলোর ব্যাবস্থা আছে। এখানেই রিসেপসন্‌, ডাইনিং রুম, বাথরুম ইত্যাদি ছিল।

ট্যুরিস্টরা বিভিন্ন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে অন্ধকারের মধ্যে ইতিউতি বসে আছে। খোলা আকাশের নিচে শান্ত অন্ধকারের তৃপ্তি নিতে নিতে গল্প, সামান্য হিমেল বাতাস তাতে যেন আরো রসদের সঞ্চয় করে যাচ্ছে। নিচ দিয়ে চন্দ্রভাগা নদীর বয়ে যাবার শব্দ কানে আসছে।

দু’জনেই তাঁবুর টিমটিমে আলোতে কিছুক্ষন বসে থাকতে থাকতে যে যার বিছানায় গা ছেড়ে দিলাম। সারাদিনের ক্লান্তি কখন চোখের পাতা এক করে দিল, নিদ্রা গেলাম কিছুক্ষনের জন্য। ঘুম ভেঙ্গে গেল হঠাৎ কিরম একটা অস্বস্তির মধ্যে। তাঁবুর নিস্প্রভ আলোর মধ্যে দেখলাম সুস্মিতাও উঠে বসে পড়েছে। সারির শেষ দিকের তাঁবু যেহেতু এটা, এদিকটা আরো চুপচাপ, কারো পদশব্দ যেন কানে আসে না। বাইরেটা এমনিতেও একদম নিঃশব্দ, শুধু নদীর বয়ে চলার শব্দ কানে আসছে। বড় বিরক্তি লাগল, যেন তাঁবুর মধ্যে সময় থেমে গেছে সেখানে।

কোন কিছুর একটা আওয়াজ শুনে সুস্মিতার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। কথা বলে বুঝলাম বেশ অস্বস্তি বোধ করছে ও। আমার বোঝানোতেও যে ওর মনে খুব একটা ছাপ পড়ছে না বুঝলাম। তাঁবুর মধ্যেকার নিস্প্রভ আলো আর জমাট বেঁধে থাকা অন্ধকারগুলো যেন চারিদিক থেকে চেপে বসছিল আমাদের ওপর। বেরোতে চাইছিলাম ওই থমকে থাকা পরিবেশ থেকে, বাইরে একটু খোলা হাওয়ায়। যদিও ওর অস্বস্তিটা সেভাবে কাটেনি, আমি জোর করে নিজেদের দু’জনকে ঠেলে বাইরে নিয়ে এলাম। বাইরেটা নিকষ কালো। তাঁবুর রাশিকে ফেলে আমরা এগিয়ে গেলাম মেন্‌ বিল্ডিং’য়ের দিকে, যেখানে যথেষ্ট আলো আছে।

রিসেপসনের সামনে খোলা জায়গায় গিয়ে খানিক্ষন বসার পর এবং একটু ধাতস্ত হতেও বুঝলাম সারা রাতটা ওই ছোট্ট অন্ধকার তাঁবুর মধ্যে কাটানো, ওর পক্ষে একটু চাপ হয়ে যেতে পারে। আর যাই হোক এবারে আমারো ওই সারির শেষ একলা হয়ে যাওয়া তাঁবুটা ঠিক ভালো লাগছিল না। একটা অদ্ভুদ না বলা অস্বস্তি হচ্ছিল। যাই হোক, আমার মনে হল এবারে একটা সিদ্ধান্ত নেবার দরকার আছে। সুস্মিতাকে মানিয়ে রিসেপসনে কথা বলে দু’তলায় একটা ঘর নিয়ে নিলাম রাতটুকুর জন্যে। ওপরের তলার একটা বড় ঘর, অ্যাটাচড্‌ বাথ, বড় বিছানা – অনন্ত রাতটা ভালো কাটবে আশা রাখতে পারি।

হোটেলের বয়ের সাথে মিলে তাঁবু থেকে আমাদের লাগেজ্‌গুলো সরানোর ব্যাবস্থা করা হল। নতুন রুমে যদিও অনেক আলো ছিল না, কিন্তু রুমের আরামদায়কতা সে কমিকে বেশী মনে হতে দিচ্ছিল না। গরম জল, নরম বিছানা, সারাদিনের ক্লান্তিকর যাত্রার পর আর কি চায় একজন যাত্রী..

ক্রমশঃ..

Can tell my Mother – I Ladakh’14

প্রথম লাদাখ্‌ সফর ২০১২ ‘এ। এরপর কেটে গেছে দুটো বছর, বয়ে গেছে বহু ঘটনার স্রোত। কিছু গুরুত্বপূর্ণ, কিছু জীবন পাল্টানোর মত – বিবাহিত হয়েছি, বাবা চলে গেছেন চিরদিনের জন্য.. আর এরমধ্যে হয়ে গেছে আমার দ্বিতীয় লাদাখ্‌ ভ্রমন। এবারে একা নয়, দোকা।

এই দ্বিতীয় ভ্রমন ২০১৪’এ। বিয়ের ঠিক দ্বিতীয় বছরে। বিয়ের পর বলা যায় এটাই আমাদের প্রথম বড় সফর। গতবারের মত এবারেও যাত্রার সময় ঠিক হয়েছিল আগষ্টের মাঝামাঝি এবং শেষ হয়েছিল সেপ্টেম্বরের শুরুতে। এবারের অনুভূতিগুলো না বললেও চলে যথেষ্ট আলাদা ছিল, যথেষ্ট স্বতন্ত্র। ফিরে আসার পরেও যার রেশ ছিল বহুদিন পর্য্যন্ত, আমাদের দুজ’নের মধ্যে।

তবে এবারে আর সেভাবে কিছু লেখা হয়ে ওঠেনি। একটা iPod ছিল বটে, যাতে আমাদের যাবতীয় যাত্রাপথ, দিনক্ষন ইত্যাদি উল্লেখ থাকত, মাঝেমধ্যে কিছু এটাসেটা বর্ণনাও, তবে সেভাবে ট্রাভেললগ্‌ বলে কিছু উল্লিখিত হয়ে ওঠেনি। কোন নোটবুকও ছিল না, বা কোন কিছু লেখার ইচ্ছাও ছিল না। এবারের পূর্ণ সময়টাই দিতে চেয়েছিলাম আমার অর্ধাঙ্গীনিকে, তার চোখ দিয়েই দেখতে চেয়েছিলাম এবারের লাদাখ্‌কে।

কিন্তু এত কিছু ঘটনা, অনুভব – কোথাও বর্ণনা করে না যাওয়াতে কিঞ্চিত অসহিষ্ণুও লাগছিল। কোথাও কোনদিন স্মৃতির অতলে হারিয়ে ফেলারও একটা ভয় ছিল।

অতঃপর সেই লাদাখ্‌ সফরের দীর্ঘ কয়েক মাস পরে এই ট্রাভেললগ্‌ লেখার সিদ্ধান্ত নিলাম, এবং ট্যারাবেকা হাতের লেখাকে ভর করে সমস্ত না-ভোলা মেমরিগুলোকে একত্র করার কাজ শুরু করলাম।

একটু ফিল্মি কায়দায় বলতে গেলে, আসুন আমাদের সঙ্গে চলুন সেই সময়ের পাতায় যেখানে adventure, uniqueness মিলে মিশে গেছে এবং এমন একটা জায়গা উঠে এসেছে যার নামেতেই সব – লাদাখ্‌।

আশা করব যাতে আগের বারের মত স্পষ্ট থাকতে পারি নিজের বর্ণনায়।
.

~ ২০শে আগষ্ট ~

ছুটিটা মিলল কিছুটা চাপের মধ্যেই। ৫/৬ মাস আগে ছুটির দরখাস্ত করেও নেবার মুখে এসে অনেক হুল খেয়ে তবেই মিলল। কর্পোরেট জীবনযাত্রা, কি বা আর করতে পারি। মোটামুটি দু’সপ্তাহের জন্য আপাততঃ সব অভিযোগ সিকেয় তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। গতবারের ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবারের ছুটির দিনক্ষনও প্ল্যান করা হয়েছিল। শুধু এই যে গতবারের ছুটিটা ১৮ই আগষ্ট শুরু হয়েছিল, আর এবারেরটা ২০শে আর ৩রা সেপ্টেম্বর অব্দি।

যাওয়া আসার প্ল্যানেও গতবারের সঙ্গে সামঞ্জস্য ছিল – বলা যায় proven গতিপথই অবলম্বন করা। তবে এবারে যেহেতু সঙ্গে আর একজন ছিল, তাই লেহ্‌ তে থাকার বন্দোবস্তটা আগে থেকেই করে নি। তবে সেখানেও কিছু নতুনত্ব ছিল না – গতবার যে গেস্টহাউসে উঠেছিলাম, সেখানেই থাকার বন্দোবস্ত করে নি খুব বেশী খোঁজাখুঁজি না করে। একবার গিয়ে থাকার সুবিদার্থে চাচাজির সঙ্গে ভালো আদিখ্যেতা হয়ে গেছিল (চাচাজি, যিনি Skitpo‘র মালিক) এবং বিদ্যুৎ-তাড়িত-ডাকের মাধ্যমেও যোগাযোগ ছিল। এ্যাডভান্স বুকিংটা তাঁরই মাধ্যমে করে নি।

আগের বারের সাথে এবারের অনেক কিছুর মিল থাকলেও একটা বড় অমিল ছিল, তা হচ্ছে শারীরিক গঠন। বেশ কয়েক কিলো মেদ অর্জনের সাথে সাথে ছিল degraded physical fitness যেটাকে নিয়ে আমি একটু চিন্তিতই ছিলাম। কিন্তু তাবলে কি একটা ট্রিপ করব না!

অতঃপর বুধবার ২০শে আগষ্ট সঠিক সময়ে যাত্রা শুরু করলাম, গন্তব্য হাওড়া স্টেশন। বিকাল ৪ঃ৫৫’এ হাওড়া-দিল্লী রাজধানী এক্সপ্রেস। যেরম বলছিলাম গতবারের মত এবারেও যাত্রাপথ একই রাখা হয়েছিল, সুতরাংঃ

হাওড়া রাজধানী -> দিল্লী
দিল্লী HPTDC বাস -> মানালি
মানালি HPTDC বাস -> লেহ্‌

আর আসার পথেঃ

লেহ্‌ ফ্লাইট -> দিল্লী
দিল্লী রাজধানী -> ঘরের ছেলে ঘরে

ট্রেন ছাড়ার কিছুটা আগেই আমরা স্টেশন পৌঁছে গেলাম, বলা যায় ‘বেশ’ কিছুটা আগে – প্রায় ২ ঘন্টা। সঠিক সময়ে ট্রেন স্টেশন ছাড়ল। বাইরে অন্ধকার নামার সাথে সাথে গাড়ির ঢুলুনি আর কামরার মধ্যেকার একঘেয়েমি, যাত্রীরা যে যার চাদরে জায়গা নিতে শুরু করল। আরো একটু রাত হতে খেয়েদেয়ে বিছানাও নিল। আমরা দু’জনে অন্ধকারের মধ্যে বসে iPod’এ গান শুনতে শুনতে অনেক্ষন কাটিয়ে দিলাম। হাজার একঘেয়েমির মধ্যে একটাই প্রশান্তির নিশ্বাস যে আমার সঙ্গে আমার বন্ধু ছিল।

রাত্রিটা খুব ঠান্ডা; ঠান্ডাতে আমার সর্দি লেগে গেল।

.

~ ২১শে আগষ্ট ~

বেশ একটু অস্বস্তি আর আধা-ঘুমন্ত অবস্থায় রাত্রিটা কাটল। একফালি বিছানা আর শেষ রাত্রির A/C ‘র কামড় প্রতিবারেই আমাকে কাবু করে, যার এবারেও কোন পরিবর্তন ছিল না।

মেখে থাকা জড়তার মধ্যে কোনভাবে অনুভব করলাম wife ‘এর ডাক। মুখের ওপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা সরানোর পরে দেখলাম চারিদিক আলোয় ভরে গেছে। সকালের নরম কিন্তু জীবনদায়ী আলোয় পুরো কামরাটা হাসছে। আমি বিছানা ছাড়লাম।

এরপর দিন অগ্রসর হতে শুরু করল চা, ব্রেকফাস্টের মধ্যে দিয়ে। সহযাত্রীরা অনেকেই নিজেদের মধ্যে অভিযোগ বিনিময় করতে লাগলেন খাবারের ক্রম-নিম্নমান গুনমান সম্বন্ধে। তাঁরা খুব খোলাখুলিভাবেই বিরক্তি দেখাতে থাকলেন টিকিটের বৃদ্ধিত দাম আর খাবারের নিম্নমান নিয়ে। কোথাও মনের কোনাতে আমিও হয়ত তাঁদের কথাগুলোকে সমর্থন করে গেলাম।

অতঃপর দিল্লীতে ট্রেন পৌঁছাল ১০ঃ২০’তে, ২০ মিনিট লেটে। আমার শালামশাই এর মধ্যে অপেক্ষায় ছিলেন স্টেশন চত্বরে। পেশায় NGO এবং কর্মগুনে এখন দিল্লীর পাকাপোক্ত বাসিন্দা, দিনটা ওঁর কুটিরেই কাটানোর সিদ্ধান্ত এবং সন্ধ্যায় বাস ধরে মানালির উদ্দেশ্যে। একটা অটো ধরে পুরানো দিল্লীর ব্যাস্ত পথ ধরে সুপ্রশস্ত রাজপথে উঠে আসা, তারপর আবারো অলিগলির মধ্যে দিয়ে সুভাষ নগর এসে পৌঁছানো। এই সময়টায় দিল্লীর গরম অনুভব করার মত বটে।

দুপুরে একপ্রস্থ ভারি খাওয়া-দাওয়া সেরে একটা ছোট্ট আয়েসের ঘুমের পরে বিকালে বাসস্ট্যান্ডে এসে যখন পৌঁছালাম, তখন সন্ধ্যে ৬ঃ০০’টা। এবারের HPTDC বাসের বোর্ডিং গতবারের থেকে আলাদা ছিল, গতবারের ছিল রাজপথ এলাকায়, এবারে মান্ডি হাউস চকে্‌। যাইহোক, ৬ঃ৩০ নাগাদ দুগ্‌গা-দুগ্‌গা বলে রওয়ানা দিল আমাদের বাস।

রাতে কোন একটি সুসজ্জিত ধাবায় খাওয়া-দাওয়া সারা, এবং আবার নাম-না-জানা নগর-রাজ্য ফেলে নিকষ কালো রাজপথ ধরে ছোটা।
.

~ ২২শে আগষ্ট ~

বাস বেশ অনেকটা লেটে মানালি এসে পৌঁছাল, গতবারের সাথে যদি তুলনা করি। গতবার যেখানে বাস পৌঁচেছিল সকাল ৭ ‘টায়, এবারে তা পৌঁছাল ৯ ‘টায়। আলোকজ্জ্বল দিন, উজ্জ্বল রোদ পরিষ্কার আকাশ। ঠান্ডা খুব একটা লাগছিল না এবং ম্যাল রোডের ব্যাস্ততাও ছিল সাধারন।

আমাদের পৌঁছানোটা অবশ্য অতটা সুখকর ছিল না। বাসেতে ৮ ‘টার পর থেকেই আমার টেনশন শুরু হয়ে গেছিল। HPTDC ‘এর লেহ্‌গামী বাসের টিকিটে departure টাইম ছিল ৯ ‘টা, আর মানালি এখনো অনেকটা দূর। বেশ কিছুটা সময় অসহনীয়ভাবে বসে কাটানোর পর ড্রাইভারের কেবিনে গিয়ে জিজ্ঞাসাই করলাম আমরা কখন মানালি গিয়ে পৌঁছাব। কথাবার্তার মধ্যে ওঁনারা (ড্রাইভার এবং কেবিনে থাকা অন্যান্যরা) জানতে চাইলেন কোন বাস ধরার আছে ইত্যাদি। জানানোয় ওঁনারা বললেন লেহ্‌’র বাস ১০ঃ০০ টায় ছাড়বে। শুনে চমকিত হলাম কিন্তু বিশ্বাসও করে উঠতে পারছিলাম সেটা বলব না, বাস তখনও মানালিগামী পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে ছুটে চলেছে। মাঝে পড়ছে বিভিন্ন বসতি, বাজার, ছোটখাটো গাড়ির জ্যাম। আমার টেনশন বাড়তে থাকে। ড্রাইভার ভদ্রলোক বললেন চিন্তা করবেন না, এই বাস পৌঁছালে তবে ওই বাস ছাড়বে। আমি তাও ভরসা করতে পারছিলাম না “কিন্তু ওঁনাদের টিকিটে লেখা আছে departure at 9:00 AM! তো আমরা কি at least ন’টার মধ্যে পৌঁছাব?” উত্তর এলো “চেষ্টা তো করছি, আর না হলে ভাববেন না – ও’ও তো আমাদেরি বাস আমি ফোন করে বলে দেব ওরা ওয়েট করবে।”

কিছুটা আশ্বস্ত আর কিঞ্চিত অসহায়তার সাথেই আবার সিটে এসে বসলাম। Wife ‘ও আমার চিন্তাটা অনুভব করতে পারছিল, কিন্তু সে বোধহয় আরো অসহায়।

অতঃপর বাস কোনরকমে পাক্কা ৯ ‘টায় মানালির পরিচিত রাস্তার এসে ঢুকল। আমার ধড়ে প্রান এলো যে এখনো একটা সুযোগ হয়ত আছে সময়কে পাল্লা দেবার (এখানে বলে রাখি ড্রাইভারদার অভয়বাণী যে লেহ্‌র বাস ১০ঃ০০ টায় ছাড়বে তখনো তা আমার বিশ্বাসের বাইরে, আমি টিকিটের সময়টাকেই ফাইনাল বলে ধরে নিয়েছি)। বাস ধীরে ধীরে ম্যাল রোডের পাশে বাস টার্মিনাসের মধ্যে ঢুকল। ঝলমলে দিন এবং রোদের মাঝে দু’জনেই খুব ব্যাস্ততার সাথে নেমে পড়লাম বাস টার্মিনাসের ব্যাস্ত ঘিঞ্জি রাস্তাতে। কিছুক্ষন অপেক্ষার পর আমাদের লাগেজ ছাড়াতে পারলাম লাগেজ হোল্ডার থেকে। তখনও আমাদের সম্পূর্ন লাগেজ ছাড়েনি, কিন্তু আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না – আমি একটা দিনও আটকে পড়তে রাজী ছিলাম না মানালিতে, সম্পূর্ণ মাল খালাসের দায়িত্ব স্ত্রী কে দিয়ে এবং সেখানেই অপেক্ষা করতে বলে আমি ছুটলাম HPTDC ‘র অফিসের উদ্দেশ্যে, হাতে লেহ্‌’র টিকিট। রপোর্টিং, কত নম্বর বাস এবং তা বেরিয়ে গেছে কিনা, এইসবই তখন ছুটছিল আমার মাথার মধ্যে।

ম্যাল রোডের ব্যাস্ত পথ ধরে ছুটছি। গায়ের উইনচিটারও মানালির উষ্ণতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘাম ছড়াচ্ছে। HPTDC ‘র অফিস বাস টার্মিনাস থেকে ৫ মিনিটের পথ, মানালি ন্যাশনাল পার্কের কাছাকাছি। ভারি নিশ্বাসে কিছুটা উঁচু পথে ছুটে যখন HPTDC ‘র অফিসে গিয়ে ঢুকলাম, তখন দাঁড়িয়ে ভালো করে কথাও বলতে পারছিলাম না। হাফরের মত শ্বাস পড়া দেখে ডেস্কের ভদ্রলোক চেয়ার দেখিয়ে বললেন আগে বসুন, তারপর কথা বলবেন। অফিসের করিডরটা তখন বেশ ফাঁকাই ছিল। বাইরের গোল টেবিলগুলোর কিছুতে বিদেশী পর্য্যটকেরা বসে গল্প করছিল, বই পড়ছিল। পরিবেশ বেশ শান্ত।

ডেস্কের ভদ্রলোক আমাদের টিকিট দেখে বললেন আপনাদের বাস এক নম্বরে আর ৯ঃ৪০ ‘এর মধ্যে রিপোর্টিং, আর ১০ঃ০০ ‘এ বাস ছাড়বে। আমার তখন তা শুনে কি অবস্থা হল ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। এক অদ্ভুত পরিশ্রান্তি যেন ছড়িয়ে পড়ল আমার সারা শরীরে, থিতিয়ে পড়লাম একটু আরো চেয়ারে। একটু সময় নিয়ে বললাম “কিন্তু আপনাদের টিকিটে যে লেখা আছে ন’টা ডিপারচার টাইম, আমি তাই ছুটে ছুটে এলাম!” – “না। ওটা ভুল। বাস দশটাতে ছাড়বে আর ন’টা ৪৫এ রিপোর্টিং টাইম, সময়মত পৌঁছে যাবেন কিন্তু!” যেন এক ভারি বোঝা হালকা হয়ে ধীরে পায়ে বেরিয়ে এলাম অফিস থেকে।

এরপর বাসস্ট্যান্ডে যখন পৌঁছালাম আমার জন্য একরাশ উদ্বিগ্নতা নিয়ে অপেক্ষা করছিল Wife। ব্যাগপত্রের ভার ভাগ করে নিলাম। হাতে সময় ছিল মোটামুটি আরো ৪৫ মিনিট। কিছু টিফিন করার উদ্দেশ্যে আবার HPTDC ‘র অফিসের দিকেই হাঁটতে শুরু করলাম আমরা, সন্ধান কোন রেস্টুরেন্টের। অতিরিক্ত লাগেজ বলতে সেরম কিছু ছিল না, পিঠে একটা রুকস্যাক যাতে আমার জিনিষপত্র আর Wife ‘এর একটা ট্রলি সুটকেস্‌ যেটা আমিই টেনে নিয়ে চললাম; কিছু খুচরো ব্যাগ যেগুলো ও নিয়েছিল, উইনচিটারটা খুলে আমার কোমরে বেঁধে নিয়ে নিয়েছিলাম – খুব শিগগিরি আর ওটার প্রয়োজন দেখছিলাম না।

ক্রমশঃ..