Featured, Ladakh14
Leave a Comment

Can tell my Mother – V Ladakh’14

যখন চোখ খুললাম বৃদ্ধা তখনও আমার দিকে চেয়ে আছেন। আমি একটু হাসলাম, দু’চারটে কথা বলার চেষ্টা করলাম ওঁনার সাথে। এর মধ্যে সুস্মিতা ফিরে এসেছে ইঞ্জেকশন আর ওষুধপত্রাদি নিয়ে। শুভ্রা গাউন পরিহিতা এক লাদাখী ডাক্তার এসে আমাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে গেলেন। শুয়ে থাকতে বলা হল আরো আধ-ঘন্টা কোন চিন্তা ছেড়ে। ভাইয়াজিরাও অনেক্ষন এসেছেন, ওঁনাদের হয়ত আরও অন্য কোথাও যাবার ছিল, কিন্তু আমার জন্যে.. সত্যি কৃতজ্ঞ ছিলাম ওঁনাদের এতটুকু সাহায্যের জন্য। ওষুধ নিয়ে এসে সুস্মিতা মোটামুটি জোর দিয়েই ওঁনাদের আর অপেক্ষা না করার অনুরোধ করে, আস্তে-সিস্টে আমরা ফিরে যেতে পারব বলে ওঁনাদের বিদায় দিয়ে এল। ভাইয়াজি ওঁনার ফোন নম্বর দিয়ে কোন প্রয়োজনেই যেন ফোন করি সেরম কথা নিয়ে প্রস্থান করলেন। সুস্মিতাকে দেখিয়ে বৃদ্ধাকে বললাম, আমার বউ। বৃদ্ধা মাথা নাড়িয়ে হাসলেন।

এরপর আরো কতক্ষন সময় বিছানায় পড়ে ছিলাম খেয়াল নেই। সুস্মিতা আমার পাশেই সারাক্ষন বসে রইল। Poor girl. অনুতপ্ত লাগছিল ওর জন্যে, এলো ঘুরতে আর কি অভিজ্ঞতা লাভ করছে। নিজের ওপর হতাশ ছিলাম খুবই।

~

অক্সিজেন এবং ইঞ্জেকশনের যুগলবন্দী ভালোই কাজ করল বলা যায়, মাথা বেশ হালকা বোধ করলাম এরপর। আমাকে আবার ডাক্তারের চেম্বারে উপস্থিত করা হল আর একপ্রস্থ চেক্‌আপের জন্য।

এরমধ্যে ডাক্তারবাবু একবার ঘুরে গেছেন আমি যে ঘরে শুয়ে ছিলাম। সে সময় আর একজনকে নিয়ে এসে অন্য একটি বেডে শুইয়ে দেয়া হয়েছিল, সাথে কিছু সঙ্গীসাথীও ছিল; দেখে মনে হল ভিনরাজ্য দিয়ে আসা কর্মচারীর দল। ডাক্তারবাবু ছেলেটিকে চেক্‌আপের পর ওষুধ লিখে দিলে, একজন বোধহয় তার মধ্যে বলেছিল ডাক্তারবাবু আপনারাই কিছু দিয়ে দিন না, এখান থেকে। ডাক্তারবাবু তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিল তা শুনে। প্রচন্ড গজগজ করতে করতে যা কিছু বলে গেলেন তার সারমর্ম যা দাঁড়ায়, সেন্ট্রাল দিয়ে কোটা-মাফিক যা ওষুধ সাপ্লাই করা হয় তা সবাইকে বিলি করার জন্য অপ্রতুল। উঁনি তাঁর নিখুঁত হিসাব দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন কত শতাংশ কোটা কাদের-কাদের জন্য মজুত, যার মধ্যে আর্মি আছে, ফরেনার আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। খুব বিরক্তির সাথে বলত লাগলেন তাহলে সব যদি বিলিই করতে থাকব, শীতকালে এখানে যখন রসদ আসা বন্ধ হয়ে যাবে – কোনরকম aids আসবে না, তখন আমাদের – লাদাখী মানুষদের কি হবে। যে সামান্য কোটা তাদের জন্য আছে তাতে চলবে (?), বিশাল একটা প্রশ্নচিহ্ন রেখে দিলেন বাকরুদ্ধ দলটির সামনে। খুব শক্তভাবেই প্রতিষ্ঠিত করে দিলেন যার যেরম দরকার বাইরের দোকান থেকে নিয়ে আসুন। আমরা দু’জনে বসে শুনে গেলাম ডাক্তারবাবুর সমস্ত বিরক্তিটুকু।

দ্বিতীয়বার চেক্‌আপের পর ডাক্তারবাবু বললেন এখন ঠিক আছে, আর যে ওষুধগুলো দেয়া হয়েছে  তিনদিন চলবে। ওঁনাকে সম্ভাষন করে আমরা লেহ্‌’র রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। বাইরে তখন সবে সন্ধ্যে নামছে। মরে বেঁচে ওঠার মত হালকা বোধ করলাম নিজেকে। মাথার যন্ত্রনা হাওয়া, নিশ্বাস নিতে সুবিধা, বুক হালকা; দুপা লাফিয়ে নেবার মত আলহাদও হয়ত কিলবিল করছিল। ফুর্তির সাথেই একটা শেয়ারের ট্যাক্সি ধরে মেন-বাজারে এসে পৌঁছলাম। সুস্মিতাও কিছুটা নিশ্বাস ফেলেছে আমাকে আবার ছন্দে ফিরতে দেখে।

মেন-বাজারের রাস্তার ওপর একটা পুরানো চাটের দোকান আছে, এক পাঞ্জাবী ভদ্রলোকের দোকান, সময়ে অসময়ে ভালো ভিড় হয়। ফুর্তির মারে ইচ্ছা হল ফুচকা খাবার। ঢুকে ফুচকার অর্ডার দেয়া হল, এরপর যতটা উৎসাহের সাথে অপেক্ষা করলাম অতটাই হতাশ হলাম একটা মুখে তুলে। বাঙালী নোলার সাথে এ স্বাদ পরিচিত নয়। কখন থেকে জিব ব্যাস্ত হচ্ছিল কিছু টক-ঝাল চাখবার জন্যে, খেয়ে উস্‌উস্‌ করব, কিন্তু সেই চাখবার ইচ্ছাটাকেই পুরো নিভিয়ে দিল। ভেতরে কিছু মিষ্টি পুর, জলটা যা দেয়া হয়েছে তাও কলকাতার ফুচকার জলের ধারেকাছে আসে না। এখন গদগদ হয়ে এতো অর্ডার করা হয়েছে খেতে তো হবেই, ফেলতে তো পারি না। তাই ইচ্ছা না থাকলেও যতটা হয় শেষ করা হল। এরমধ্যে দুটো ছোলা-বাটোরার অর্ডার হয়ে গেছে। ফুচকা মুখে দেবার পর প্রমাদ গোনার জায়গা থাকল না যে কে জানে কি অপেক্ষা করছে আবার সেখানে।

বাড়ি ফেরার পথে দুই ভদ্রলোকের সাথে দেখা হল আমাদের গেস্টহাউসের। এঁনারা সব ভিন রাজ্যের লোক কর্মসূত্রে এখানেই থাকেন একটা কি দুটো রুম নিয়ে, একিসাথে রান্না-খাওয়া এবং বহুদিন থাকার দরুন মোটামুটি লোকালই হয়ে গেছেন। তাঁরা ভাইয়াজী বা কারো কাছ থেকে জেনেছেন আমার অসুস্থতার কথা, বেশ উৎকণ্ঠার সাথেই খোঁজখবর নিলেন আমাদের। আন্তরিকতার সাথে বলেও রাখলেন যেন কোন প্রয়োজনেই ডাকতে দ্বিধা না করি ওঁনাদের সে যত রাতই হোক। অস্বীকার করব না, ফরেন ল্যান্ডে এসে এরকম আন্তরিকতায় মন ভরে গেল। আমি তো চিনিও না ভালো করে এঁনাদের।

রুমে ফিরে এসে কিছুটা পরিশ্রান্ত লাগলেও ওষুধ থাকার দরুন চিন্তাটা কম ছিল। দুটো ছোলা-বাটোরার অনেকটাই বাড়তি হল। ওষুধ খেয়ে মোটামুটি রাতের মত ঘুম, নির্বিঘ্নেই কাটল রাতটা।

~

~ ২৫শে আগষ্ট ~

পরের দিন লেহ্‌ বেড়ানোর প্ল্যান বাদ দেয়া হল। একদিনের জন্য হলেও একটু রেস্ট এমতবস্থায় ঠিক মনে হল। একটু দিন গড়াতে বেরিয়ে কিছু জিনিষপত্র কেনা, বাড়িতে ফোন করা ইত্যাদি ছোটখাটো কাজ সারলাম, খুব একটা কিছু অসুবিধা মনে হচ্ছিল না এখন। ওষুধগুলো তাদের কাজ করছে, দুপুরে বাইরে গিয়ে লাঞ্চ এবং তারপর একটু ইতিউতি ঘোরবার প্ল্যান হল।

মেন্‌ মার্কেটের অদূরবর্তী একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে উঠলাম আমরা, দোতলায় পরিষ্কার-পরিছন্ন। সেদিন নাকি আবার সারা লেহ্‌’তে নিরামিষ, কারন জানলাম না। মেনু দেখে ভেজ বিরিয়ানী, মালাই পনীর আর ওমলেট অর্ডার করা হল। বিরিয়ানী দেখে দুজনেই কিনারা করতে পারলাম না সেটা আমাদের চেনা কোন বিরিয়ানীর সাথে। দু’টো বিশাল সাইজের ওমলেট আমাদের জন্য একটু বেশীই ছিল। বিলিংয়ের সময় অনেকটাই খাবার পরে থাকতে দেখে ওয়েটার কৌতুহল রাখতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল খাবার কি ভালো হয়নি? যতটা সম্ভব ভদ্রতা রেখেই জানালাম এটা আমরা যেরম খেতে অভস্ত্য সেরম হয়নি, এটা আমাদের কাছে অনেকটা পোলাওয়ের মত। ওয়েটার শুনে বলল কিন্তু লাদাখে এরম বিরিয়ানীই হয়ে থাকে। বেশী কথা না বাড়িয়ে হেসে রেস্টুরেন্ট ত্যাগ করা হল।

হাতে অনেকটা সময়, পেটও ভারি, দুজনে ইতিউতি ঘোরার সিদ্ধান্ত নিলাম। মেন্‌ বাজারের লাগোয়া একটি নিচু মনাস্ট্রিতে গিয়ে ঢোকা হল। দুপুরের শান্ত নিঃঝুম পরিবেশ, বেশী ভিড়ও নেই, ইতিউতি কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পর্য্যটক, লোকাল এবং বৌদ্ধিক ভিক্ষুরা। চারিদিক ঘুরে ভেতরে এসে বসলাম। বিশাল মেঝের কোন এক কোনা বেছে নিয়ে দুজনে বসলাম। আমাদের সুদূর অপর প্রান্তে গুরু পদ্মসম্ভবা, গৌতম বুদ্ধের মূর্তি, এবং আরো কিছু মূর্তি ও ছবি। কতক্ষন বসে ছিলাম জানি না, মন্দিরের শান্ত প্রশান্তি দুজনকেই কোথায় নিয়ে চলে গেছিল। কোন একসময় এক লাদাখি মহিলা এসে আমাদের পাশেই বসলেন। ওঁনার প্রার্থনার সাথে বুকে কিছু দুমড়ে মুচড়ে উঠল, চোখ ভরে গেল আমার। জানি না কি সেই প্রার্থনা ছিল।

dsc_0307

DSC_0308

এরপর আরো কিছুক্ষন বসে থেকে, ছবি তুলে তারপর আমরা বেরিয়ে এলাম। হাতে এখনও অঢেল সময় দিন গড়াতে, একটা গাড়ি নিয়ে কিছুটা দূরেই অবস্থিত লেহ্‌ প্যালাস দেখতে গেলাম। এটা আমাদের রুমের বারান্দা দিয়েও দেখা যায়।

টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকা হল। দুপুরের রৌদ্র ছায়ায় ধুলোময় প্যালাসকে যেন আরো বিবর্ণ লাগছিল। কিছুর একটা প্রদর্শনী হচ্ছিল ভেতরে। প্যালাসের কিছু ঘর নিয়ে লাইন দেয়া স্ট্যান্ডে ছবি এবং অসংখ্য লেখা। হয়ত এই প্যালাসের ওপরেই কিছু। পড়ার সেরম ইচ্ছা পেলাম না। ছাদে এসে লেহ্‌ শহরের বিশাল পড়ে থাকা দৃশ্য উপভোগ করলাম। কিছু ছবি তোলা হল, আরো কিছুক্ষন পরে আমার আগের জানা সর্টকাট নিয়ে হেঁটে মেন্‌ বাজারে নেমে এলাম।

পরের দিন লেহ্‌র সাইড সীনের জন্য ভাইয়াজীর সাথে কথা বলে একটা গাড়ি ঠিক করা হল। সকাল ৯টায় আসার পতিশ্রুতি পেয়ে, বাইরে ডিনার সেরে আমাদের কুঠুরিতে ঢুকে পড়লাম। রাতটুকু ভালোই কাটল।

ক্রমশঃ..

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s