Featured, Ladakh14
Leave a Comment

Can tell my Mother – IV Ladakh’14

একটা সময় বাসটা কোথাও থামতেই আমি নেমে গেলাম অন্যান্যদের সাথে। বিকেলের আলো তখন চারিদিক ছুঁয়েছে। এখানটা একটু সমতল। কোন এক পাহাড়ি ভ্যালির সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। বাদামি পাহাড়ের সারির মধ্যে আঁকাবাকা রাস্তাটা মিশে গেছে, বিকেলের শেষ রোদ পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে আলোর খেলা খেলে যাচ্ছে।

যেখানে দাঁড়িয়েছি সেই রাস্তার পাশেই সরু নালা দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল স্বচ্ছ জল। গাড়ির খালাসী সেই জল নিয়ে গাড়ি পরিষ্কারের কাজে লেগে গেল। আমি জল দিয়ে নিজের মুখচোখ ধুয়ে নিলাম। বড় সতেজ লাগছিল পাহাড়ি ঠান্ডা জল মুখেতে পড়াতে, বাসের ক্রমাগত ঝাঁকানি থেকে বেরিয়ে এসে। আরো যাত্রীরা এরমধ্যে নেমে এসেছে। কেউ জলে হাত-মুখ ধুতে লাগল কেউবা প্রকৃতির শোভা নিহরনে ব্যাস্ত হল। কিছুক্ষন পর আমরা আবার চলমান হলাম, তবে এবারে অনেক সতেজ লাগছিলে নিজেকে।

~

অবশেষে সন্ধ্যা ৬ঃ০০ নাগাদ আমরা লেহ্‌ বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছলাম। এরমধ্যে বাস আর একবার থেমেছিল, এবং আরএক বাস যাত্রী উল্টি করল। যাক, আর একজন উল্টেছে, মনে মনে ভেবেছিলাম।

যখন বাসস্ট্যান্ডে পৌছলাম দু’জনেই বিদ্ধস্ত। দিনের আলো তখনও আছে, তবে জার্নিতে দু’জনেই ক্লান্ত। রাকস্যাকটা পিঠে নিয়ে ট্রলিব্যাগটা টানতেও যেন বড় কষ্ট হচ্ছিল। শরীর আর বইছিল না, ছেড়ে বসে যেতে চাইছিল। একটা শেয়ার ট্যাক্সি ধরে মেন বাজারে এসে পৌঁছলাম। বিকালের আলো তখন কমতে শুরু করেছে, দোকানে দোকানে আলো জ্বলে উঠছে। মেন বাজার এলাকাতে রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলছে তাই গাড়ি একটা সীমানার পর আর ঢুকতে দিচ্ছে না। আমাদের মেন বাজারের মুখেই নেমে পড়তে হল। আবার লাগেজ নিয়ে ট্রলিব্যাগটাকে টানতে টানতে বাজারের পথ ধরলাম।

মনে হচ্ছিল পথ যেন শেষ হচ্ছে না। মাথা যন্ত্রনা আর ক্লান্তি নিয়ে সামান্য খাড়াই রাস্তাতেও জিনিষপত্র নিয়ে এগোতে কষ্ট হচ্ছিল। মোটামুটি ১০ মিনিটের মত লাগল Skitpo Guest House পৌঁছতে।

আগেরবার মান সিং ছিল, এবারে কে – ভাবতে ভাবতে গেস্ট হাউসের দরজায় এসে পৌঁছলাম। ততক্ষনে চারদিক মোটামুটি অন্ধকার হয়ে গেছে, এসে দেখলাম গেস্ট হাউসও অন্ধকার। নিচের ড্রইং-কাম-রিসেপসনের অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই বেরিয়ে এল কোন এক ছেলে। চাচাজীর খোঁজ করতে ওপরে চলে গেল, কিছুক্ষনের মধ্যে ভাইয়াজি নেমে এলেন। সম্ভাষন করলেন চিনতে পেরে। জানলাম লোডশেডিং চলছে আর চাচাজী গেছেন শ্রীনগর। রুমের কথা বলাতে বললেন আপনাদের রুমটা কাল পেয়ে যাবেন, আজকের রাতটা একটা সিঙ্গল রুমে একটু কাটিয়ে নিতে। অগত্যা আমাদের মালপত্র নিয়ে উঠে আসতে হল সেই রুমটাতে যেটাতে আমি গতবার সিংহভাগ সময় কাটিয়েছিলাম। সিঙ্গল হলেও রুম ছোট নয় বা বিছানাও, তবে হ্যাঁ সেরম আরামদায়ক নয়।

যাই হোক, এক রাতের ব্যাপার, আর দু’জনেই এত ক্লান্ত যে একটু ফ্রেশ হয়ে স্যারিডন খেয়ে শুয়ে পড়লাম, খাবারেও সেরম কিছু রুচি ছিল না। রাতে ঘুমটা খুব একটা ভালো হল তা নয়, দুই তক্তপোশের জোড়ার উঁচুনিচু বিরক্ত করল।

.

~ ২৪শে আগষ্ট ~

সকালের ঘুমটা ভাঙল একটা অস্বস্তির মধ্যে। আগের দিনের ধকল, আনফিট্‌নেস – বুঝলাম জ্বর মতন আছে। মাথা যন্ত্রনাও যেন পিছন ছাড়ছে না। একটা ক্রোসিন খেয়ে নিলাম যাতে নিজেকে ঠিক রাখা যায়, বিরক্তি লাগল নিজের শরীর নিয়ে।

বলাই বাহুল্য, ঘুরতে এসে আমার এই নতুন অবতার – সুস্মিতাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ওর অসহায়তা পরিষ্কার, ট্রিপেরও আর কোন কেয়ার ছিল না যদি আমি না সুস্থ থাকি। ওকে দেখে আরো বিরক্ত হয়ে পড়ছিলাম নিজের ওপর, রাগ হচ্ছিল যে কোথায় নিয়ে এসেছি আজ আমাকে, কোন physical fitness নেই!

একটা ক্রোসিন আর স্যারিডন খেয়ে অপেক্ষায় রইলাম একটু সুস্থ বোধ করার জন্যে, কিছু পরে একটু বেরিয়ে মেন বাজারের দিকে গেলাম আমি।

এখানকার রাস্তাঘাট মোটামুটি সবই চেনা। সকালের নরম রোদে বাইরের ব্যাস্ততা তখন শুরু হয়ে গেছে। মেন বাজারের ভাঙা রাস্তার পাশ কাটিয়ে দোকানে গিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র কিনলাম, বাড়িতে ফোন করলাম, একটা বইও কিনলাম (Holy Cow, an Indian adventure) সময় কাটানোর জন্য।

গেস্ট হাউসে ফিরে খোঁজ নিলাম কখন রুম বদলাতে পারব বা কি হল।

সম্মতি পাওয়ার পর তিনতলার রুমে সিফট্‌ করার কাজ শুরু হল। দু’টো রুম চয়েসের মধ্যে দিয়ে একটা বেছে নেয়া হল – ধারের ঘর, ছোট হলেও দু’টো বড় জানলা আছে যার একটা টপকালে একটা ছোট বারান্দাও আছে। ড্‌বল বেড, অ্যাটাচড্‌ বাথ এবং টিভি। এরমধ্যে চাচাজীও ফিরে এসেছেন, এসে আমাদের খোঁজখবর করলেন, সুস্মিতার সাথে পরিচয় করানো হল, Wi-fi‘এরও বন্দোবস্ত করে দিলেন।

এরপর চানটান সেরে দুপুরের দিকে বেরোন হল লাঞ্চের জন্য। সুস্মিতার এই প্রথম বেরোনো লেহ্‌’র রাস্তায়, গতকাল সেই এসে ঢোকার পর। মেন-বাজারের ব্যাস্ততার মধ্যে দিয়ে সামান্য এগিয়ে অদূরবর্তী একটি রস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম আমরা। শরীরের অস্বস্তিগুলো বা যার জন্যেই হোক খাবার খুব একটা ভালো লাগল না। আমার অবস্থা বুঝে সুস্মিতাও সেরম চাপ দিল না, সামান্য খেয়ে দুজনে বেরিয়ে এলাম। পাশাপাশি নীরবে হেঁটে সামান্য উঁচু রাস্তা ধরে ফেরার পথ ধরলাম; বুঝতে পারছিলাম সেও চিন্তিত।

~

কিছুটা খাড়াই বা রোদ – যাই হোক, সামান্য রাস্তা হেঁটে ফিরতেও নিশ্বাস উঠে গেল। বারংবার দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছিল নিশ্বাস নেবার জন্যে। বুকে ক্ষীন ব্যাথা, অবশেষে ঘরে এসে যখন পৌঁছলাম বুঝলাম জ্বর বাড়তে শুরু করেছে। সঙ্গে বেশ মাথা যন্ত্রনা, এবং নতুন সংযোজন বুকের চাপ যা থেকে শ্বাস কষ্ট। জটিলতা ঘিরে ধরছে ক্রমশঃ আমাকে। প্রচন্ডভাবে চাইছিলাম ঠিক হতে, নিজের জন্যে এবং সুস্মিতার জন্যে, এ ট্রিপটা ওর জন্যই রাখা ছিল; কিন্তু এখন ওকে দুশ্চিন্তা ছাড়া কিছুই দিতে পারছি না।

আবার একটা ক্রোসিন খেয়ে নিজেকে ঠিক রাখার কসরত শুরু করলাম। একটু শোবারও চেষ্টা করলাম যাতে ওষুধও কাজ করে এবং পরিশ্রমও আর না হয়। সুস্মিতা এদিকে আরো চিন্তিত হয়ে পড়ছিল, ওর অসহায়তা ওর দিকে তাকালে বোঝা যায়। আমি শুধু নিজের অবস্থাকেই দুষছিলাম। কখন জানিনা একটু চোখের পাতা লেগে গেল।

কতক্ষন ঘুমিয়েছি জানি না, কিছুটা অস্বস্তির মধ্যেই ঘুম ভাঙল। বিস্বাদ মুখ, ভারি মাথা আর গা গরম নিয়ে দেখলাম তখনও দুপুরই আছে। সুস্মিতা ঘুমোয়নি। দু’জনে বসে আলোচনা করলাম বিকালের মধ্যে না কমলে আমরা ডাক্তারখানা থেকে ঘুরে আসব। সেটা হয়ত কোথাও দু’জনকেই কিছুটা শান্ত করল। আমি সত্যি এই অস্বস্তির মধ্যে দিয়ে বেরোতে চাইছিলাম। যদিও একটা ব্যাপারে প্রমাদ গুনতে লাগলাম – দিনটা ছিল রবিবার, আশঙ্কা ছিল ডাক্তারের উপস্থিতি নিয়ে।

কোনমতে দুপুরটা কাটিয়ে বিকাল হতেই আমরা নিচে নেমে এলাম, শারীরিক অস্বস্তি নিয়েই রিসেপ্‌সনে বসে রইলাম। উদ্দেশ্য এদের কারোর সাথে কথা বলে কোন ডাক্তারের খোঁজ পাওয়া। মান সিংহের জায়গায় যে নতুন ছেলেটি ছিল তাকে সবকিছু বলাতে সে ভাইয়াজির খোঁজ করল, শুনলাম তিনি বেরিয়েছেন। ডাক্তারের বিষয়ে ছেলেটিও বেশী কিছু বলতে পারল না। এসবের মধ্যেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যখন বসে আছি, ভাবছি কি করব, তখন বাইরে থেকে ছেলেটি ছুটে এসে বলল ভাইয়াজি বাইরে গাড়িতে বসে আছেন, আপনারা গিয়ে কথা বলে নিন। শরীরের উত্তাপ আর মাথা যন্ত্রনাতে এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে সুস্মিতা আমাকে বসিয়ে নিজেই ছুটল বাইরে। কিছুক্ষনের মধ্যে এসে জানাল ভাইয়াজি বলছেন আজকে কোন ডাক্তার নেই, প্রাইভেটেও কোন ডাক্তার এখন আসবে না; হাসপাতালে যেতে হবে। উঁনি বলছেন এখুনি ওঁনার সাথে আসতে। আমাদের পছন্দের কোন ব্যাপার ছিল না, সুস্মিতা ছুটল ওপরে ওর ব্যাগপত্র আনতে। ফিরে আমাকে ধরে বাইরে নিয়ে এল, ভাইয়াজি গাড়িতেই অপেক্ষা করছিলেন, আমাদের গাড়ি ছুটল অদূরবর্তী আর্মি হাসপাতালের দিকে।

SNM Hospital Leh, অদূরেই অবস্থিত লেহ্‌ শহরের একটি সেনা হাসপাতাল, গাড়িতে ১৫ মিনিটের পথ, ঢালু পথ ধরে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি।

বিকালের নরম আলোয় আমরা হাসপাতালে এসে পৌঁছলাম। এখানে ভাইয়াজির ভালো চেনাশোনা আছে বুঝলাম; চেকআপের কার্ড করানো হল, কিছুক্ষনের মধ্যে ডাক্তারের সামনে উপস্থিতও করা হল। ভাইয়াজি আর আমাদের গাড়িতে আসা অন্য ভদ্রলোক বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

চেকআপের পর জানলাম একটু চিন্তা আছে, ডাক্তারবাবু বললেন আধঘন্টা অক্সিজেন নিন আর কিছু ইঞ্জেকশন। তার সাথে কিছু ওষুধও প্রেস্ক্রাইব করলেন। পরে লক্ষ্য করেছিলাম এর মধ্যে একটা ওষুধ যেটার সম্বন্ধে আমি আগেই শুনেছিলাম, altitude sickness‘এর কথা চলাকালীন গেস্ট হাউসে অন্যান্যদের সাথে। পরে এও বুঝেছিলাম altitude sickness‘এর জন্যে খুব কার্য্যকারী ওষুধ হিসাবে পরিচিতও এখানে – Diamox 250 (recommended twice a day for 3 days).

Hospital

হাসপাতালে একটা বেড দেয়া হল আমার জন্যে। মোটামুটি পরিষ্কার-পরিছন্ন পাহাড়ি হাসপাতাল। বাইরে কিছু মানুষ এখনো অপেক্ষারত ডাক্তারের ভিসিটিং আওয়ার্সে। পরিষ্কার সাদা চাদর পাতা একটি বিছানায় আমাকে আধ-শোয়া করে দেয়া হল। সুস্মিতা বেরিয়ে গেছে পেসক্রিপস্‌নের ওষুধ আনতে। এখানে রানিং কেসে হাসপাতাল থেকে কোন ওষুধ দেয়া হয় না, রুগীর লোকদেরই তার বন্দোবস্ত করতে হয়, ওষুধের দোকান অদূরেই রাস্তার ওপারে কোথাও। কিছুক্ষনের মধ্যে একজন হোম-ডাক্তার এসে আমার পেছনে রাখা একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারের ভাল্ভ খুলে আমার দু’ই নাকের মধ্যে একটা বাঁকানো নল আটকে দিলেন। “চিন্তা করবেন না, শুয়ে থাকুন আর নিশ্বাস নিতে থাকুন।” এরপর ভদ্রলোক প্রস্থান করলেন। গা ছেড়ে পড়ে রইলাম বিছানায়। অবস্থার এরম আকস্মিকতায় কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ়। উল্টোদিকের বেডে এক বৃদ্ধা লাদাখী বসে, হাতে স্যালাইনের নল আটকানো। চেয়ে ছিলেন আমার দিকে। রুমের মধ্যে আরো চারটে বেড ফাঁকা। আমি একটু চোখ বোজানোর চেষ্টা করলাম।

.

ক্রমশঃ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s