North Bengal, Photologue, Sandakphu
Leave a Comment

Photologue: Sandakphu – II

05.20.2011

সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম বাইরে তখন রোদ ঝলমলে দিন। বাংলোর চারিদিকে ঘিরে থাকা গাছপালা থেকে কিচ্‌-কিচ্‌ করে পাখির কলতান ভেসে আসছে। আমরা একটু হয়তো বেশীই ঘুমিয়ে নিয়েছিলাম, তারপর দুদ্দাড় করে উঠে পড়তে হল শমীকের তাড়া খেয়ে। ন’টার সময় গাড়ি আসবে, তারি মধ্যে খেয়েদেয়ে নিয়ে আমাদের তৈরি হতে হবে।

মামি চটজলদি ব্রেকফাস্ট তৈরি করেই রেখেছিলেন, আমরা ব্রাশ করে খেতে বসে গেলাম। বাইরে তখন মনোরম পরিবেশ, স্বচ্ছ আকাশ সুন্দর রোদ।

ন’টার সময় করে গাড়ি এসে গেল আমাদের নিতে, মামাই সমস্ত ব্যাবস্থা করে রেখেছিলেন। একটা মারুতি ওমনি যেটা আমাদের যাত্রার জন্য যথেষ্ট ছিল। আমরা মালপত্র ভরে সবাইকে বিদায় জানিয়ে দুগগা্‌-দুগগা্‌ বলে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, মিঠে ঘর-বাড়ি চায়ের বাগান পেছনে ফেলে। কিছু দূরে পেট্রল পাম্পে তেল ভরে ফের চলার শুরু হল আমাদের।

আমরা মিরিক হয়ে মানেভঞ্জন গিয়ে পৌঁছালাম তখন বেলা গড়িয়ে দুপুর এসে পড়েছে। যদিও আকাশ ততক্ষনে মুখ গোমড়া করে নিয়েছে, মেঘলা আকাশ ছেয়ে গেছে আমাদের ওপরে। মিরিকেই আমরা একটু একটু ঠান্ডা বোধ করাতে আমাদের গরমের কাপড় কিছু বের করে নিয়ে পড়ে নিয়েছিলাম। আমাদের চিন্তাটা আবার একটু ঘিরে ধরল একটা দিনের অপচয় নিয়ে যেটা শুরু হয়েছিল ট্রাকের অ্যাক্সিডেন্ট থেকে আর তারপর একটা দিন শিলিগুড়িতে আটকে পড়াতে। মানেভঞ্জনে আমাদের পোর্টার (গাইড)-এর ব্যাবস্থা করার ছিল যেটা এখানে ট্রেক করতে গেলে একটা অবশ্য জরুরী ব্যাপার।

মানেভঞ্জন পাহাড়ের গায়ের এক ছোটখাটো জনবসতি যেখান থেকে আরো উঁচুতে যাবার রাস্তা উঠে গেছে। ট্রেকার্সদের কাছে এতা একরকম গেটওয়ে হিসাবে কাজ করে সান্দাকফু যাবার পথে। সরু রাস্তার দুপাশে লাইন দিয়ে বসতি, দোকান, রেস্টুরেন্ট, হরেক রকম পসরা সাজিয়ে তারা বসে আছে। পাথুরে রাস্তা নগরীর মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে সরু হয়ে কোথাও উঁচুতে মিশে গেছে। আমি ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম, শমীক আর অয়ন ছুটল পোর্টার-এর খোঁজে এবং ট্যাক্স পেমেন্ট করার জন্যে (এখানে ট্রেক করতে হলে দিন হিসাবে একটা ট্যাক্স দিতে হয় লোকাল ইউনিয়নকে)। আমরা তখনো কিছুটা অনিশ্চিত ছিলাম ওই এক দিনের অপচয়টা কিভাবে ম্যানাজ করা যায় সেটা নিয়ে, schedule যেখানে আমাদের টাইট আর প্রতিটা দিন এক একটা ভাগের ট্রেকের জন্য নির্ধারিত ছিল। আমরা তাও পোর্টার এবং অন্যান্য সবকিছুর ব্যাবস্থা করতে লাগলাম কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতই বেশি আলোচনা না করে, যেন আজ থেকেই আমরা ট্রেক করতে শুরু করব এবং এখন শুরু করলে মোটামুটি টুম্বলিনে পৌঁছে যাব – কেননা আজকেই আমাদের টুম্বলিনে পৌঁছানোর কথা। যেমন করেই হোক আমাদের আজ পৌঁছতেই হবে ওই ঘাটতিটুকু পূরনের জন্য। আমি দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম অদূরেই লোকালদের WW-II জমানার Land Rover জিপগুলো ধোয়ামোছা হচ্ছে। এই গাড়িগুলো যে এখনো এখানে চলে সেটা আশ্চর্য্য লাগে!

শমীক আর অয়ন ফিরে আসতে মোটামুটি সবকিছু মিটিয়ে তখন আমিই কথাটা তুললাম যে একটা গাড়ি করে টুম্বলিন পৌঁছে গেলে কেমন হয়। এমনিতেই আমাদের একটা দিন নষ্ট হয়েছে, তারপর এখন ট্রেক শুরু করলে কখন গিয়ে পৌঁছাব সেটাও একটু অনিশ্চিত লাগছিল আকাশের পরিস্থিতি দেখে। দুজনেই আমার কথাটা বুঝল এবং সায়ও দিল, বেলাও গড়িয়ে যাচ্ছিল। সেই বুঝে আমরা কাছের ল্যান্ড রোভারের দিকে এগিয়ে গেলাম এবং টুম্বলিন অব্দি যাত্রার জন্য কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম।

এখানে এই গাড়িগুলো সুদূর সান্দাকফু অব্দি যায়। যাঁদের হাঁটার ইচ্ছা বা অবস্থা নেই তাঁরা ইচ্ছা করলে এখানে গাড়ি ভাড়া করে সোজা সান্দাকফু পর্য্যন্ত উঠে যেতে পারেন। অনেক কথাবার্তার পর ড্রাইভারের সাথে চুক্তি হল ৩০০০ টাকার টুম্বলিন অব্দি পৌঁছে দেয়ার জন্য। কিছুটা steep আমাদের পক্ষে, কিন্তু আমাদের কাছে সেই সময় এটাই বেশী লজিকাল ছিল। আমরা আমাদের মালপত্র প্রাচীন ল্যান্ড রোভারে প্যাক করতে শুরু করলাম।

এখানে ল্যান্ড রোভার গুলোর একটু বর্ণনা না দিলেই নয়। বেশ লম্বাই, সামনে ড্রাইভারকে নিয়ে দু’টো সিট্‌। গাড়ির স্টিয়ারিংও সেই আদ্যিকালের জগদম্বা হুইলের মত। জীপের ওপরটা তের্পল দিয়ে ঢাকা, at least ভিজবো না। পিছনে আদপে সিট্‌ বলতে যা বোঝায় কিছুই নেই; দু’দিকে লম্বা করে পাতা দু’টো কাঠের বেঞ্চ মাত্র; যার ওপর বসলে কত অজস্র লম্ফঝম্প করতে হয় সেটা বুঝেছিলাম কিছুটা পরেই গাড়িটা পাথুরে রাস্তার ওপর পড়তেই।

যাই হোক, মালপত্র বোঝাই করতে করতেই টপ টপ করে ফোঁটা শুরু হয়ে গেছিল। আমরা সমস্ত মালপত্র ড্রাইভার ও তার গাড়িতে ছেড়ে সামনে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই আকাশ কালো করে দুদ্দাড় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আমরা একটা আনন্দকর ঠান্ডার মধ্যে রেস্টুরেন্টে বসে আমাদের লাঞ্চ সারলাম মিক্সড নুডল/ফ্রায়েড রাইসের সাথে; আর তারপর অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন বৃষ্টি থামবে আর তারপর আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করতে পারব। বাইরে তখনো প্রকৃতি অঝোর ধারায় সরু পাহাড়ি রাস্তাটাকে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। আমরা কিছুটা চিন্তিত হয়েই অপেক্ষা করতে লাগলাম বৃষ্টি থামার জন্যে।

সহযাত্রী। ছবিঃ অয়ন দাসগুপ্ত

সহযাত্রী। ছবিঃ অয়ন দাসগুপ্ত

অবশেষে বৃষ্টিটা একটু ধরতে আমরা এসে উপনীত হলাম সেই কঠিন ঝর্জরিত ল্যান্ড রোভারে। আমি সামনে বসলাম ড্রাইভারের পাশে। অয়ন আর শমীক পেছনের সিটে্‌। আমরা উৎফুল্ল ছিলাম অবশেষে যাত্রা শুরু করতে পারায়। বাইরে তখন মেঘলা ভিজে পরিবেশ। পথিমধ্যে গাড়িতে গেস্ট সহযাত্রী হয়ে উঠে এলেন এক লোকাল বুদ্ধিস্ট সন্ন্যাসী তাঁর ক্রেট ভর্তি ডিম নিয়ে, একজন আর্মি পার্সনেল, আর এক বয়স্কা তাঁর সুন্দর টুকটুকে লালমুখো বাচ্চাকে নিয়ে। সকলেই কোথাও না কোথাও নেমে গেলেন তাঁরা আমাদের চলার পথে।

তবে টুম্বলিন অব্দি রাস্তা আমাদের বাইরের মনোরম পরিবেশকে ভুলিয়ে তুলেছিল। বিশেষ করে কষ্ট হচ্ছিল অয়ন আর শমীকের পেছনে বসার জন্যে। কাঠের বেঞ্চ সজোরে তাদের উঁচুতে ছুঁড়ে দিচ্ছিল যখনি গাড়ির চাকা মুহূর্মুহু ওবোড়-খাবোড় রাস্তার ওপরে দিয়ে লাফিয়ে উঠছিল। অসমান অজস্র পাথর যেন এক জায়গায় জড়ো হয়ে এক অস্বাভাবিক ঐকতান সৃষ্টি করেছিল রাস্তার নামে! কোথাও এমন একটু রাস্তাও ছিল না যেখানে গাড়িটা সমান্তরালে চলেছে মনে হয়। আদ্যিকালের এই ঝরঝরে ল্যান্ড রোভারটা কিভাবে সবকিছু ভেঙে টেনে টেনে ঠিক এঁকেবেঁকে উঠছিল তা আমাদের সত্যি আশ্চর্য্য লাগছিল; কিন্তু পরক্ষনেই সেটা হারিয়ে যাচ্ছিল পরবর্তী ঝংকার খেতে খেতে। অবস্থা এমনি সঙ্গিন হল যে অয়ন আর শমীক আশাই ছেড়ে দিল ভদ্রভাবে বসে থাকার, তারা ওপরের রড ধরে আধা বসে দাঁড়িয়ে সময় কাটিয়ে দিল। নিচে তক্তার সজোর থাপ্পড় সত্যি নাজেহাল করে দিয়েছিল তাদের। পথিমধ্যে কোথাও একটু গাড়ি দাঁড়াতেই চা খাওয়ার জন্যে আমরা লাফিয়ে দুদ্দাড় করে বেরিয়ে পড়লাম। যদিও সেটা কতটা চা খাওয়ার উৎসাহে সেটা নিশ্চই আর পাঠকদের বোঝাতে হবে না।

বাঁকাচোরা রাস্তা টুম্বলিনের উদ্দেশ্যে

বাঁকাচোরা রাস্তা টুম্বলিনের উদ্দেশ্যে

পাহাড়ি রাস্তার কুয়াশা পেরিয়ে প্রচন্ড বাম্পি রোডের বেদনা সয়ে আমরা যখন টুম্বলিনে এসে পোঁছলাম তখন চার’টে। বিকালের নরম ভিজে আবহাওয়া আর ঠান্ডা পরিবেশ আমাদের ব্যথা ভুলিয়ে দিচ্ছিল। মন ফুরফুর করে উড়ছিল উত্তর বা দখিনা বাতাসের সাথে। পাহাড়ের ওপর একটা ছোট জনবসতি, মোটামুটি বেশীরভাগ বাড়িই ট্রেকার্স-হাট হিসাবে ব্যবহার হয় এখানে। আমরা একটা সুন্দর উঁচু দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। বাড়ির সামনের বোর্ডে লেখা ‘Welcome to Nepal‘ আর একটা ছোট ম্যাপ। আমরা দেখে শিহরিত হলাম যে আমরা নেপালে পৌঁছে গেছি! পরে জানলাম জায়গাটা নেপাল ও দার্জীলিং বর্ডারে আর এজায়গাটা মোটামুটি নেপালই মানা হয় এখানে। আমাদের পোর্টার পিটার রাই আমাদের ব্যবস্থা করবার জন্যে ভেতরে নিয়ে গেল আমাদের। ঝকঝকে পাহাড়ি কম বয়েসী ছেলে, শীঘ্রই ফ্যামিলিয়ার হয়ে গেছিল আমাদের সঙ্গে।

সিদ্ধার্থ লজের সামনে, টুম্বলিন

সিদ্ধার্থ লজের সামনে, টুম্বলিন

আমার ছবি তাও একটা দু'টো কুকুর থাকবে না তাও কি হয়

আমার ছবি তাও একটা দু’টো কুকুর থাকবে না তাও কি হয়

খেলাচ্ছলে কিছু ফ্যামিলিয়ার ফেস্‌

খেলাচ্ছলে কিছু ফ্যামিলিয়ার ফেস্‌

আমরা যখন উঠে এসেছিলাম তখন কুয়াশার দরুন কিছুই দেখতে পারিনি বলা যায়। রাস্তার ধারের পাহাড়ের ঢাল দূরবর্তী পাহাড়ের রাশি সবই মোটামুটি ঢাকা ছিল কুয়াশায়। সাময়িক কথাবার্তার পরে আমরা ট্রেকার্স-হাটের সরু কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সন্তর্পনে উঠে আধা-অন্ধকারে এক কাঠের ঘরের মধ্যে আমাদের মালপত্র নামালাম। টিমটিমে একটা আলো, কয়েকটা ঠাণ্ডা বিছানা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। মালপত্র যেখান যা ফেলে আমরা কিঞ্চিত দেহ রাখলাম সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে। তারপর আমরা উঠে বেরিয়ে পড়লাম বাইরেটা ঘুরব বলে। বাইরে বিকালের নরম আলো তখনও আছে আর এরম সময় বাড়িতে বসে থাকার কোন মানে হয় না। বাইরের ঠান্ডা হাওয়ায় আমরা বেরিয়ে এলাম।

কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘন সাদা কুয়াশা সরে গিয়ে আমাদের সামনে এক অদ্ভুত সুন্দর পৃথিবী খুলে গেল। যেখানে পুঁজি পুঁজি মেঘ পাহাড়ের চোটি বেয়ে বয়ে চলেছে, দূরবর্তী বাদামি ও নীল পাহাড়ের রাশি আর ঠিকরে পড়া পড়ন্ত সূর্য্যের আলো এক অদ্ভুত মাদক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে; যেখানে পৃথিবীর সমস্ত মসৃণ রংগুলো নিয়ে কে যেন এক অদ্ভুত সুন্দর গ্রেডিয়েন্ট সৃষ্টি করে দিয়েছে যা হাজার আর্টিস্ট মিলেও তৈরি করতে পারবে না। আমরা মুগ্ধ চোখে শুধু গিলে যেতে লাগলাম প্রকৃতির এই বিরল দৃশ্যকে এবং সেই সময় সেখানে উপস্থিত হওয়াকে। এহেন ক্ষন খুব কম মানুষেরই আসে যখন নিজেকে দেখে মেঘেরও ওপরে, যেখানে মেঘ নিচে পাহাড়ি হাজারো বাঁকের মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, স্থির ও ব্যস্ততাহীন।

DSC_0056

কিছু বলার থাকে না..

কিছু বলার থাকে না..

দূর এই রাস্তা বেয়েই উঠে এসেছিলাম আমরা টুম্বলিনে

দূর এই রাস্তা বেয়েই উঠে এসেছিলাম আমরা টুম্বলিনে

রাতটা বেশ কম্বলমুড়ি দিয়ে ঠাণ্ডা কাঠের বিছানায় ভালোই কাটলো আমাদের, এক পরম পাওয়া বিশ্রাম। রাত্রে  ট্রেকার্স-হাটেই আমরা ডিনার সারলাম সুস্বাদু গরম থুপকা আর তিবেতান ব্রেড সহকারে। বাইরের জমাট অন্ধকার ক্রমশঃ ঘরের মধ্যে ভারি হয়ে যেতে থাকলে আমরা লাইট নিভিয়ে কম্বলের তলায় আশ্রয় নিলাম। কাল থেকে আমাদের আসল পদযাত্রা শুরু যাকে ট্রেকিং বলে। আমরা ভুরভুর করছিলাম এক্সাইটমেন্টে, নাকি ঠান্ডায়, কে জানে..

ক্রমশঃ..

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s